দেবযানী সরকার, কলকাতা: কংগ্রেস কাউন্সিলরদের সঙ্গে কলকাতা পুরবোর্ডের চেয়ারপার্সন মালা রায়ের তুমুল ধস্তাধস্তিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠল পুরসভার মাসিক অধিবেশন৷ মালা রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার অধিবেশন বয়কট করেন কংগ্রেস কাউন্সিলররা৷ এর পরই তাঁরা চেয়ারপার্সনের ঘরের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসে পড়েন৷ অধিবেশন শেষ হওয়ার পর নিজের ঘরে ঢুকতে গেলে কংগ্রেস কাউন্সিলরদের বাধার মুখে পড়েন মালা রায়৷ শুরু হয় প্রবল হুজ্জুতি৷ এরপর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিলে পুরবোর্ডের চেয়ারপার্সনকে ঘরে ঢুকতে দেন কংগ্রেস কাউন্সিলররা৷

ঘটনার সূত্রপাত ৮৮ নম্বর ওয়ার্ডে গড়ে ওঠা মালা রায়ের স্বামী নির্বেদ রায়ের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে কেন্দ্র করে৷ অভিযোগ, ২০০৩ সালে ৫৬/২ নং প্রতাপাদিত্য রোড, এই ঠিকানায় কলকাতা পুরসভার জমিতে নির্বেদ রায়ের ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা একটি কমিউনিটি হল গড়ে তোলে এবং সেখান থেকে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা করে পুরসভাকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে৷ ওই ঠিকানায় একতলায় ছিল মালা রায়ের ওয়ার্ড অফিস৷ বাড়িটির দুই এবং তিনতলা নিয়ে ম্যাস এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নামে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি গড়ে তোলা হয় বলে কংগ্রেস কাউন্সিলাররা জানিয়েছেন৷ ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর, পুরসভার মাসিক অধিবেশনে তৃণমূল কাউন্সিলর পারমিতা চট্টোপাধ্যায় প্রথম পুর কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি আনেন৷ মালা রায় তখন হাত চিহ্নে জিতে পুরসভার বিরোধী আসনে কংগ্রেস দলনেত্রী৷ পারমিতা চট্টোপাধ্যায়ের ওই বক্তব্যের জবাবে মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় জানান, পুরসভা জমিটির দখল নেবে এবং প্রাপ্য অর্থ আদায়ের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থাও নেবে৷
কংগ্রেসের তৎকালীন দলনেত্রী মালা রায় অবশ্য তখন অধিবেশন কক্ষেই পারমিতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দাবি করেছিলেন যে, পুরসভার ছাড়পত্র পেয়েই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি কমিউনিটি হল নির্মাণ করেছে৷ অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন৷
২০১৪ সালে পুরসভা জমিটি অধিগ্রহণ করে এবং সেইসঙ্গে প্রাপ্য টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়৷ বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন৷
এর পর ছবিটি বদলে যায়৷ মালা রায় এখন তৃণমূলের হয়ে জিতে শাসকপক্ষেরই একজন হেভিওয়েট কাউন্সিলর৷ শুধু তাই নয়, তিনিই এবার পুরবোর্ডের চেয়ারপার্সন৷
কিন্তু তাঁর পুরানো শাগরেদরা ছাড়বে কেন? মালা রায়ের একদা ‘সহযোদ্ধা’ ২৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা বর্তমানে পুরসভার কংগ্রেস দলনেতা প্রকাশ উপাধ্যায় এদিন চাপা পড়ে থাকা বিষয়টি ফের খুঁচিয়ে তোলেন৷ প্রতাপাদিত্য রোডের কমিউনিটি হল নিয়ে মালা রায়ের বিরুদ্ধে মেয়রের উক্তি মনে করিয়েই এদিন অধিবেশন চলাকালীন প্রকাশবাবু পুর চেয়ারপার্সন অর্থাৎ সেই মালা রায়ের কাছেই ব্যাপারটি সবিস্তারে জানতে চান ৷ মালা রায় তাঁর কথা খারিজ করে দিতেই ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বরে পুরসভার মাসিক অধিবেশনে মেয়রের বক্তব্য সংবলিত কাগজটি মালা রায়ের দিকে ছুঁড়ে মারেন প্রকাশ উপাধ্যায়৷ এর পরই অধিবেশনকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান কংগ্রেস কাউন্সিলররা৷ প্রকাশ উপাধ্যায় বলেন, মালা রায় পুর চেয়ারপার্সন পদের যোগ্য নন৷ তিনি এবং তাঁর পরিবার বড়সড় আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত৷ নিজেকে বাঁচাতেই তিনি তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন৷
অবশ্য মালা রায়ের দাবি, বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করছে কংগ্রেস৷ তাঁর বক্তব্য, জমিটি পুরসভা অধিগ্রহণ করে নিয়েছে এবং বাকিটা আদালতের বিচারাধীন৷ সে কারণেই বিষয়টি নিয়ে তিনি পুর অধিবেশনে আলোচনা করতে বাধা দিয়েছেন৷
তবে পুরসভার অলিন্দে শোনা গেল, মালা রায় ও প্রকাশ উপাধ্যায় দুজনেই যখন কংগ্রেসে, তখন উভয়ের সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল৷ শুধু একই দলে থাকার জন্য কেউই কারও বিরুদ্ধে প্রকাশ্য মুখ খুলতেন না৷ মালা রায় তৃণমূল কংগ্রেসে ফের যোগ দেওয়ার পর সেই সুযোগ প্রকাশ উপাধ্যায়ের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে৷ অম্ল-কষায় প্রতিশোধের এই সুযোগ হাতছাড়া না করে তাই নতুন পুরবোর্ডের প্রথম অধিবেশনেই খোদ চেয়ারপার্সনকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন তিনি৷