বাংলাদেশ

বন্যাদুর্গত অঞ্চলে ত্রাণ বিতরণে সাম্প্রদায়িক বৈষম্য, বঞ্চিত হয়েছে হিন্দুরা

By kolkata24x7 online desk

September 09, 2017

বাসুদেব ধর, ঢাকা: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বন্যায় অন্তত ২৫টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়িঘর, ফসল হারিয়ে পথে বসেছে সব সম্প্রদায়ের কয়েক লাখ মানুষ। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের সামনে। এই পরিস্থিতিতেও সরকারি সহযোগিতা ও ত্রাণ বিতরণে বৈষম্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। কয়েকটি জেলা ঘুরে এবং দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলে এই অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

দিনাজপুর শহরের কালীতলা থেকে চৌরঙ্গী যাওয়ার রাস্তাসহ পুরো এলাকা বন্যার জলে ভেসে যাওয়ায় হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন শহরের শ্মশান কালীমন্দিরে। প্রায় ৪০০ হিন্দু পরিবার৷ জানা গিয়েছে, কোনো সাহায্য সেখানে আসেনি৷ মন্দিরের বারান্দা ও নাটমন্দিরে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্ত মানুষগুলোর জন্যে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসেনি। তাদের অভিযোগ হিন্দু হওয়ার কারণেই তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

পল্লব চক্রবর্তী জানান, সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা তারা পাননি। দেবাশিস দাস জানালেন, স্থানীয় পুর-সদস্য একদিন এসে কিছু চিড়া-গুড় দিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর কেউ খবর নিতেও আসেনি। দিনাজপুর সদরের পাশে একটি জলমগ্ন ফসলের ক্ষেতের পাশে পাওয়া গেল উত্তর গোবিন্দপুরের এক গৃহবধূকে। তিনি বিপ্লব দাসের স্ত্রী, উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন জলমগ্ন ক্ষেতের দিকে।

বন্যায় কী কী ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, আমাদের সব গেছে বাবা। রোপা ফসল ডুবে গেছে, একটু ধানও পাবো না। ‘উপোষ থাকতি হবে’৷ সরকারের ত্রাণ পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো ইলিশ আইসে নাই’। দিনাজপুরের চৌরঙ্গী পাড়ার বধূয়া বসাক জানালেন, রাস্তার পাশে ডোবা ও পুকুর ছিল। কিন্তু এটি দখল করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে জল নামতে পারেনি।

পল্লববাবু আরও বললেন, মন্দির থেকে দুপুরে অন্ন প্রসাদের ব্যবস্থা হয়েছে। নইলে আমাদের উপোষ করতে হতো। লিপন দাস বলেন, আর ক’দিন পর দুর্গাপুজো। মায়ের প্রতিমা গড়া হচ্ছিল। বন্যায় প্রতিমা ভেসে গেছে। এসময় পাশে দাঁড়ানো শুভাশিস দাস বলে ওঠেন, পুজার কথা রাখেন। এখন খাবারের কথা ভাবেন।

জীবন দাস বলেন, বন্যায় আমার ঘরের সব ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে৷ শুধু টেলিভিশনটা মাথায় করে নিয়ে এসেছি। স্মৃতি দাস ও তার স্বামী সুশান্ত দাস বলেন, পরনের কাপড় ছাড়া সবই গেছে। শহরে একটি সুপারির দোকান ছিল, প্রায় ৫০ হাজার টাকার সুপারি ছিল। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। জীবনটা উল্টোপাল্টা হয়ে গেল।

রঞ্জনা দাস বলেন, টেলিভিশন গেছে, ফ্রিজ গেছে, আইপডও গেছে। সব নষ্ট হলো। এখন খাবারের জন্যে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার ঐতিহাসিক কান্তজীউর মন্দিরে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে ২০টি হিন্দু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরই একজন দুলালী দাস বলেন, ‘হামাক কেউ কিছু দ্যায় নাই। বন্যায় ডুবি আছে ঘরবাড়ি, কেউ সাহায্য করতাছে না। মন্দিরের প্রসাদ খেয়ে বাঁচি রইচি।’ কুমুদিনী দাস বলেন, ‘হামরাও কষ্টত আচি। প্রসাদ ছাড়া খাবার নাই।’ এই কাহারোল উপজেলার কান্তজীউর মন্দির সংলগ্ন দাসপাড়া, মিস্ত্রীপাড়া তলিয়ে যাওয়ার পর এখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন কান্তজীউর মন্দিরে আশ্রয় নেন। শুধু প্রসাদ খেয়ে আছেন, কোনো সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ আসেনি।

শুধু দিনাজপুর নয়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নওগাঁ এবং গাইবান্ধা সবখানেই এক চিত্র। বন্যার্ত সংখ্যালঘু হিন্দুদের অভিযোগ, ত্রাণ দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও ত্রাণ দেওয়া হলেও অন্য সম্প্রদায়ের বন্যার্ত মানুষের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তারা মনে করছেন, মুসলমান সম্প্রদায়ের বন্যার্ত মানুষের মতো তাদের সঙ্গে আচরণ করা হচ্ছে না। কুড়িগ্রামে সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের মাঝির গাঁওয়ের কাঞ্চন বালা ওঠেন চান্দেরখানম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে। তিনি কেঁদে কেঁদে ব্রহ্মপুত্রের ধ্বংসলীলা বর্ণনা করে বলেন, একদিন ভোরে ব্রহ্মপুত্র আমাদের সবকিছু গিলে খেয়েছে। এখানে এসে ক্ষুধায় মরি। লিলি নমঃশূদ্র বলেন, ‘বাহে হামরা এলাও ইলিপ পাই নাই বাহে। হামাক সাহায্য দিয়া বাঁচান।’ এই আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেন ৪০টি হিন্দু পরিবার। তাদের পেশা মাছধরা।

অভিযোগ, সরকারের কোন লোক আসে নাই। আমাদের দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার দুর্গম চাঞ্চল্যের বন্যার্ত হিন্দুরা খাবারের অভাবে ধুঁকছে। কুড়িগ্রামের চিলমারি উপজেলার খরখরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতেই অন্তত ২০ জন দুর্গত মানুষ ছুটে আসেন, ‘হামাক খাওয়ার দ্যাও।’ এদের সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। বাড়ি বিভিন্ন চরে। বানের জলে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ায় এই আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন। সবারই অভিযোগ কোনো ত্রাণ আসেনি তাদের জন্য। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিণ সির্ন্দুনা ইউনিয়নের ক্ষত্রিয়পাড়ায় গিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়, সর্বস্ব হারিয়েছেন তারা।

কিন্তু কোন সাহায্য মেলেনি। অথচ অন্যদের কয়েক দফা সাহায্য দেওয়া হয়েছে। লালমনিরহাটের সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের বনগ্রামের চিত্রও একই। নওগাঁর রানীনগর উপজেলার ঘোষগ্রাম, নান্দাইবাড়ি গ্রাম কিংবা গাইবান্ধার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গিয়ে একই অভিযোগ শুনতে হয়েছে।