রাধি মাসিকে মনে আছে তো? সেই রাধী মাসিকে এলাকার তাবড় সকলে সমঝে চলতেন, কারণ রাধি মাসির ব্যক্তিত্ব। মাসির সঙ্গে কথা হচ্ছে: – মাসি তুমি নাকি প্রায় রোজ মদ খাও? – সর, সর, সর, এখন সব বাড়িতে কাজ পড়ে রইছে। – তা তো বুঝলাম, তবে তুমি জবাবটা দিলে না তো। তুমি কি রোজই মদ খাও? – খাবার জন্যে করেছে। খাব নাই? খুবই সঙ্গত উত্তর। মাসির কথায় কোনও জড়তা নেই। – সত্যিই তো মানুষ যখন খবার জন্য বানিয়েছে তখন খেতে হবে বই কি। – তা বলে এরকম মারামারি করে লাইনে দাঁড়াতে হবে? যেন আয় প্রমত্ত আয়রে আমার কাঁচা বলে ডাক এসেছে। – হ্যাঁ, প্রয়োজনে দৌড়তেও হবে।

সাংবাদিক- গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

দেশে যেভাবে সমস্ত জিনিসপত্রের আকাল পড়ে যাচ্ছে তাতে কতদিন বিশুদ্ধ সুরা হাতের কাছে মিলবে কে জানে। – তবে যে বিশুদ্ধবাদীরা বলছেন, এতে নাকি ভাইরাসগোষ্ঠীদের পোয়াবারো হবে। – তা হতে পারে, তার জন্য তো মদ খাওয়া বাদ পড়তে পারে না। মদের বহু গুণ। খইনির থেকেও কয়েকগুণ বেশি। – খইনির কথা আবার আসছে কী জন্যে? – তাহলে বলি শোন। বাড়ি ফিরছি লাস্ট ট্রেনে। রাত এগারোটা হবে। সে কি আজকের কথা। অন্তত বছর ত্রিশ আগের সে রাত। কামরায় মুখোমুখি বসিবার বলতে এক রেল সুরক্ষা বাহিনীর জওয়ান। – বেশ, তারপর? – তো সে জওয়ানের জামার বোতাম খোলা, প্যান্টের জিপের অবস্থাও তথৈবচ।

মুখ থেকে মৃদুমন্দ সুরার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে কামরার আনাচে কানাচে। অল্প পরেই তিনি পকেট থেকে বার করলেন তাঁর অমূল্য খইনির কৌটো। বাঁ হাতের তালুতে পোয়াটাক খইনি নিয়ে চূর্ণ করে ডললেন যত্ন করে। কৌটো থেকে বেরোল চুনের গোলা, মিশ্রিত হল তার সঙ্গে। আহাহা! মুখে তাঁর শিল্পীর পূর্ণ একাগ্রতা। যেন পাকশালে তৈরি হচ্ছে আমিনিয়ার বিরিয়ানি। খইনির গন্ধে ম ম করছে আকাশ বাতাস। বাইরে নিকষ অন্ধকার। ট্রেন পেরিয়ে চলেছে হুস হুস করে। শিল্পকর্ম শেষ করে তিনি এক চিমটে তুলে নিয়ে একেবারে ধরলেন আমার মুখের সামনে। সে গন্ধ সরাসরি আমার পাকস্থলীতে ঢুঁ মারল।

শ্বাস বন্ধ করে কোনওরকমে বলি: -হম নই লেতে হ্যায়। আমার কথা শুনে তাঁর চোখ মুখে অপার বিস্ময়। বাক্যহারা হয়ে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত। সম্বিত ফিরতে তাঁর সনির্বন্ধ অনুরোধ… – খইনি হ্যায় সার, লিজিয়ে। – হম নহি লেতে হ্যায় ভাই। – লেনা চাহিয়ে। হর আদমি লেতে হ্যায়। খইনি কা তিন গুণ। জানতে হ্যায়? না, আমার সে তথ্য জানা ছিল না। অগত্যা সে কথা কবুল করতেই হল। আমার অজ্ঞতা দেখে তিনি সামান্য বিরক্ত। – আপকো খইনি লেনা চাহিয়ে। পুছিয়ে কিঁউ? – কিঁউ? – এক তো ইসসে আপকা পেট সাফা রহতা হ্যায়। দুসরা আপকা দাঁত অচ্ছা রহতা হ্যায়, অউর তিসরা কারণ খইনি সস্তা হ্যায়।

এত সব শোনার পরেও আমার খইনির নেশা করার ইচ্ছে জাগেনি। হতে পারে আমারই ত্রুটি। তবে এটা বুঝেছি, নেশা মশাই একা করার জিনিস নয়। সে খইনিই হোক বা মদই হোক। সব একসঙ্গে ঠেলাঠেলি করে কেনা হবে। একসঙ্গে পাত পেড়ে বসা হবে। ঢালার আগেই চোখে নেশা লাগবে। তবে না নেশা। -এখন তো তা করা যাবে না। একসঙ্গে বসার সুযোগটাই তো নেই। – সব আছে রে বাবা, সব আছে।

মদ খাবে আর ইয়ার জুটবে না তা কি কখনও হয়? ঠিক জুটে যাবে। মদ পেটে পড়তেই তুমি হচ্ছ জমিদারের বাচ্চা। তখন তুমি আর নাই সে তুমি। নিমচাঁদ কী বলে গেছেন? ‘এক ব্যাটা বড় মানুষের ছেলে মদ ধল্লে দ্বাদশটি মাতাল প্রতিপালন হয়।’ – নিমচাঁদটি কে? – কে আবার সধবার একাদশীর নিমচাঁদ দত্ত।

যাই হোক কথাটি খাঁটি তো নাকি? – হ্যাঁ, তা আর বলতে। তবে যেভাবে মদ বিকোচ্ছে তাতে তো ভাইরাসকে দু’হাত তুলে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তারপর সকলে মিলে একেবারে নরক গুলজার করলে আর কি রক্ষে থাকবে? – দেখ নিমচাঁদ থাকলে এখনই খিস্তি খেতে, ‘অফর কল্যে না খেলে যে কত অপমান বাঞ্চত কিছু বোঝে না, পাজি, চাসা, ক্যাডাভারাস।’ – আচ্ছা, আচ্ছা থামাও তো এবার। – দেখ বাপু মানুষ অতি বিচিত্র প্রাণী। তাকে বাগ মানানো বড় কঠিন। সে নিজেকেই কি বাগ মানাতে পারে?

সে তো শুধু শরীর নয়, শরীরের মধ্যে আছে মন। সে এক মারাত্মক বস্তু। সে নিজেকে নিয়ে কখনও খুশি নয়। সে একের মধ্যে হতে চায় হাজারজন। শোন কী বলছেন ভি এস রামচন্দ্রণ। স্নায়ুবিজ্ঞানী, দুনিয়া জোড়া তাঁর নামডাক। তিনি এমন সব ঘটনার ব্যাখ্যা করেছেন যে পড়লে মাথা বিগড়ে যাবে। এ টেল টেল ব্রেন গ্রন্থে লিখেছেন, মাথার মধ্যে কোটি কোটি নিউরনের বিচ্ছুরণ আর সংখ্যাতীত স্নায়ুতন্ত্রের কারবার। তাদের একটি আধটি এধার ওধার হয়ে গেলেই মানুষের জন্মইস্তক যে সত্তার সঙ্গে তোমার পরিচয় সে উবে গিয়ে সেখানে উঠে আসবে অচেনা সব সত্তা।

নিজের মনের মধ্যে ডুব মারলে তল খুঁজে পাবে না রে ভাই। তাইতো নেশার এত দাম। পেটে দু’পেগ পড়লে ঝিলিক মারে মাথায়। হারু মোড়ল হয়ে যায় শাহরুখ খান, গোবিন্দ মুখুজ্যে হয়ে যায় বিল গেটস। তার কি মূল্য কম রে ভাই। – দূর দূর বাজে বকছ বড্ড। সরকার বাহাদুরের হাতে টাকা নেই বলে এভাবে মদ বিকোচ্ছে।

সুস্থ মাথাকে বশে রাখা কঠিন, নেশাড়ুকে বশে আনা অনেক সহজ। এই হল সহজ সমীকরণ। এ অঙ্ক সকলেই বোঝে তবে সুরার নেশার কাছে সকলেই জব্দ। – তাহলে উপায়? – উপায়, হয় মনকে চাবকে সিধে কর। না হলে, ‘খুব খানিকটা কেঁদে কেটে/ অশ্রু ঢেলে ঘড়া ঘড়া/ মনের সঙ্গে এক রকমে/ করে নে ভাই, বোঝাপড়া।’

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ