সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারংবার বলে এসেছেন জন্ম থেকে মৃত্যু সর্বদা প্রত্যেকের পাশে রয়েছে তাঁর ‘জনদরদী’ সরকার। রাজ্য শনিবার ঘটে গিয়েছে এমন এক ঘটনা যা মুখ্যমন্ত্রীর একপ্রকার বেদবাক্যে পরিণত হওয়া ওই কথাগুলিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ জয়ী মৃত বিপ্লব বৈদ্যর মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারের ইচ্ছে অবশেষে পূরণ করা গেল না। বিপ্লব বৈদ্যর স্ত্রী রেখা বৈদ্য স্বামীর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার জন্য গণদর্পণের সঙ্গে ২২ মে যোগাযোগ করেছিলেন ২২মে। তখনও বিপ্লবের দেহ কলকাতায় এসে পৌঁছায়নি। পরিবারের ইচ্ছার পাশাপাশি পর্বতারোহী নিজে অনেক আগেই তাঁর দেহ দান করেছিলেন। অভিযোগ, তারপরেও রাজ্য যুবকল্যাণ দফতরের তরফে দেহ দানে বাধা দেওয়া হয়।

সংস্থার অন্যতম সদস্য তনুকা রায় বলেন , “সন্ধ্যা ৬’টার সময় বিপ্লব বৈদ্যের দেহ বিমানবন্দরে আসার কথা ছিল। ওনার স্ত্রী তাই আমাদেরকে ১২টার সময় ফোন করে বলেন যে আমরা কখন কিভাবে কাজ করব না করব। আমরাও সেই মতো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু ৩টে নাগাদ রেখাদেবী ফের আমাদের ফোন করে বলেন উনি দেহ দান করতে পারবেন না। আমরা স্বভাবতই অবাক হয়েছিলাম।” তনুকা রায়ের কথায় , “আমরা কারণ জিজ্ঞাসা করলে উনি এক জনৈক মন্ত্রীর নাম করে বলেন তিনি ওনাকে দেহ দান করতে বারন করেছেন। মন্ত্রী বলেছেন দেহ দান করে মেডিকেলের কোনও কাজে লাগবে না।”

সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের সোশ্যাল পেজে অভিযোগের তীর যুব কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের দিকে। তিনিই রেখাদেবীকে এই কথাই বলেন যে , বিপ্লবের বৈদ্যের দেহ যেহেতু অনেক রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সংরক্ষন করা হয়েছে তাই সেই দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের আর কোনও কাজে লাগবে না। সংস্থার অভিযোগ, মন্ত্রীর কথাতেই মত পরিবর্তন করেন পর্বতারোহীর স্ত্রী। ফলে বিপ্লব ১৮ বছর আগে তাঁর যে শেষ ইচ্ছা সে প্রকাশ করেছিল তা আর সত্যি হয়নি। রেখা দেবী তাদেরকে জানান, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ওই কথা বলেছেন তাই বিপ্লব বৈদ্যর মরদেহ দান করা যাবে না।

অভিযোগ, মন্ত্রী মহোদয় নাকি এও জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত করা মরদেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনও কাজে লাগে না। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে , এই ধরণের দেহের স্কেলিটান ও হাড়াংশ, এম বি বি এস শিক্ষার্থীদের অ্যানাটমি পাঠের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু মন্ত্রীর ‘সবজান্তা’ কাজের জন্য একজনের শেষ ইচ্ছা সম্পূর্ণ হল না। এখানেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের , জন্ম থেকে মৃত্যু তাঁর সরকার মানুষের সঙ্গে থাকে এই প্রচার। এই প্রসঙ্গে বারংবার অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর যোগাযোগ পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত , ২০০১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী বিপ্লব বৈদ্য মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেছিলেন। স্বাক্ষী হিসেবে ছিলেন পাইকপাড়া রো-এর বিশ্বজিৎ দে আর বি টি রোডের শাওন সেন। ৪ এপ্রিল, ২০১৯। কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ অভিজানের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন সোনারপুর আরোহী ক্লাব থেকে বিপ্লব বৈদ্য ও রুদ্রপ্রসাদ হালদার, হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট মাউন্টেনিয়ার্স অ্যান্ড ট্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের কুন্তল কাঁড়ার, মাউন্ট কোয়েস্ট ক্লাবের রমেশ রায় আর ইছাপুরের সাহাবুদ্দিন।কলকাতা থেকে রওনা দিলেও প্রাকৃতিক দূর্যোগের জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙের অভিযান পিছোতে থাকে। অবশেষে ১৪মে মূল সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তারপরের দিন ১৫ মে মূল সামিটের যাওয়ার আগেই কুন্তল কাঁড়ার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে মারা যান। বাকী চার জন মূল লক্ষ্যে পৌঁছে যান। রুদ্রপ্রসাদ হালদার ও রমেশ রায়ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখন তারা সুস্থ আছেন। কিন্তু ফেরার পথে ক্যাম্প ফোরের আগে বিপ্লব বৈদ্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

সমব্যথী প্রকল্প হল রাজ্য সরকারের মৃত্যু পরবর্তী ক্রিয়ার জন্য সাহায্যের প্রকল্প। ২০১৬ সালে রাজ্যে সরকারের অধীনে চালু করা হয় এই প্রকল্প। পরিবারের বা খুব আপনজনের মৃত্যুর পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম খরচ অথবা কবর দেওয়া খরচের জন্য আর্থিক অনুদান দেয় সরকার। অসহায় মানুষদের দুঃসময়ে তাদের পাশের দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই প্রকল্পের এর মূল উদ্দেশ্যে। প্রকল্পের সঙ্গে ঘটনার যোগ না থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার করা কথা যে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন তাঁরই মন্ত্রী তা স্পষ্ট।