স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা ও লালগড়: সবকিছু ঠিক থাকলে দীপাবলির পরই জেলমুক্তি হতে পারে লালগড়ের ‘পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি’র একদা দোদর্ন্ডপ্রতাপ নেতা ছত্রধর মাহাতোর৷ এমনই দাবি খোদ ছত্রধরের আইনজীবী কৌশিক সিনহার, ‘‘এরাজ্যে আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে থাকা মোট ২৮ টি মামলার মধ্যে ১৩টিতে ইতিমধ্যেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন৷ বিচারাধীন অন্য ১৪টি মামলায় জামিনে মুক্ত৷

অপর একটি মামলায় হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় খারিজ করে দেওয়ায় সেটিরও নিস্পত্তি হয়ে গিয়েছে৷ ঝাড়খণ্ডের মামলায় ঘাটশিলা আদালতে জামিনের আবেদন জানানো হয়েছে৷ আশা করছি কালীপুজোর পরই জামিন হয়ে যাবে৷’’

পুলিশ ও আদালত সূ্ত্রের খবর, ২০০৯ সালের ৩১ মে ঘাটশিলার চাকুলিয়া থানার সীমান্তবর্তী এলাকায় নাশকতা চালানোর অভিযোগে ১৭/২ (criminal law amended act) ধারায় ছত্রধরের বিরুদ্ধে (কেস নম্ব- ২৮/০৯, ৩১/০৫/২০০৯) রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা রুজু করে ঝাড়খণ্ড পুলিশ৷ ঘাটশিলা এসডিজেএম এজলাসে মামলাটির শুনানী চলছে৷ গত ১৫ অক্টোবর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে সরাসরি ঘাটশিলা আদালতের বিচারকের মুখোমুখি হয়েছিলেন ছত্রধর৷ সেদিনই জামিনের আবেদন দাখিল করেন তাঁর আইনজীবী৷ ১৪দিন পরে ফের শুনানী হওয়ার কথা৷ ওই দিনই ছত্রধরের জামিন হতে পারে বলে দাবি কৌশিকবাবুর৷

স্বভাবতই, ছত্রধরের জেলমুক্তিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই জঙ্গলমহলের শিবিরে শিবিরে রাজনৈতিক অঙ্ক কষা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ বিজেপির ঝাড়গ্রামের জেলা সভাপতি সুখময় শতপথির অভিযোগ, ‘‘তৃণমূল নেতাদের লাগাম ছাড়া দুর্নীতির জেরে জঙ্গলমহলের মানুষ তৃণমূলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন৷ তাই ছত্রধরকে সামনে রেখে জঙ্গলমহলের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ লোকসভার আগে থেকেই ছত্রধরকে বারংবার প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাকে ব্যবহার শুরু করেছে শাসকদল৷ এবার জেলমুক্তি হলে তাকে পুরো দস্তুর কাজে লাগাবে ওরা৷ তাই এখন থেকেই তৃণমূল জঙ্গলমহলে সন্ত্রাসের রাজনীতি শুরু করেছে৷’’

একই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘তৃণমূল যত গোলমাল করবে ততই মানুষ ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন৷ ছত্রধরকে এনেও জঙ্গলমহলে তৃণমূলের ছিন্নমূল দশা রক্ষা পাবে না৷ আগামী দিনে জঙ্গলমহলে গেরুয়া উত্থান আরও বাড়বে৷’’

তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলেও শোনা যাচ্ছে, ছত্রধরকে সামনে রেখে জঙ্গলমহল পুনরুদ্ধারের ‘গল্প’ মিথ্যে নয়৷ এবিষয়ে শাসকদলের রাজ্যস্তরের এক নেতার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো এতবার কেউ জঙ্গলমহলে বারংবার ছুটে যাননি, আগের কোনও সরকারের জমানায় বাংলার এত উন্নয়নও হয়নি৷ জঙ্গলমহলের মানুষও অতীতে এত উন্নয়নের সুফল পাননি৷ অথচ লোকসভা নির্বাচনে আমাদের সবেচেয়ে ভরাডুবি হাল হয়েছে জঙ্গলমহলেই৷ মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ার দুটি আসনেই আমরা বিজেপির কাছে পরাজিত হয়েছি৷ এর থেকেই স্পষ্ট শুধু উন্নয়ন দিয়ে জঙ্গলমহলের ভোট ব্যাংক ধরে রাখা সম্ভব নয়৷ তাই ছত্রধরকে সামনে রেখেই আমরা নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছি৷’’

‘কি সেই পরিকল্পনা’ তা অবশ্য খোলসা করেননি শাসকদলের ওই প্রভাবশালী নেতা৷ তবে দলেরই একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে ছত্রধরের কারাবাসের সময়কালে তার পরিবারের পাশে যেভাবে দল থেকেই তারই প্রতিদান ইতিমধ্যে দিতে শুরু করেছেন ছত্রধর৷ লোকসভা ভোটের আগে জঙ্গলমহলের আদিবাসী সমাজের একাধিক ব্যক্তি ফোনে ছত্রধরের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়েছেন৷ যেখানে বিজেপিকে রুখতে সবাইকে তৃণমূলের ছত্রছায়ায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি৷ বিজেপির অভিযোগ অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূলের জেলা সভানেত্রী বিরবাহা সরেন৷ ‘‘মানুষ আমাদের সঙ্গেই রয়েছেন’’ বলার পাশাপাশি তাঁর সাবধানী প্রতিক্রিয়া, ‘‘ছত্রধর দলে যোগ দিচ্ছেন কি না তা আমার জানা নেই৷ তবে উনি দলে যোগ দিলে স্বাগত৷’

কে এই ছত্রধর? প্রায় এক দশক আগের জঙ্গলমহলে ফিরে গেলে দেখা যায়, লালগড় থানা থেকে সাকুল্যে কিলোমিটার খানেক দূরের এক অখ্যাত গ্রাম আমলিয়ার চাষি পরিবারের সন্তান ছত্রধর মাহাতো৷ রূপোলী সিনেমার মতো নাটকীয় কায়দায় রাতরাতি উল্কার গতিতে তাঁর উত্থান জঙ্গলমহলে৷ ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর৷

পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনীর জামবেদিয়ায় জিন্দল গোষ্টীর ইস্পাত কারখানার শিলান্যাস সেরে ফেরার পথে ভাদুতলায় ৬০ নম্বর জাতীয় সড়কে মাওবাদীদের ল্যাণ্ডমাইন বিস্ফোরণের মুখে পড়ে তদানীন্তন বাম মুখ্যমন্তীর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সহ দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কনভয়৷ সময়ের হেরফের অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান ভিভিআইপিরা৷ তারপরই জঙ্গলমহলে পুলিশি ধরপাকড়ের প্রতিবাদে লালগড়ে গড়ে ওঠে ‘পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি’৷ রাতরাতি কমিটির সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠেন ছত্রধর৷ শুধু লালগড় নয়, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া সহ তিন জেলার তামাম জঙ্গলমহলে কমিটির শেষ কথা তখন তিনিই৷ পরের বছর দুর্গাপুজোর ষষ্টীর দিন ২৫ সেপ্টেম্বর লালগড় থেকেই ছত্রধরকে পাকড়াও করে রাজ্য গোয়েন্দা পুলিশ৷ কাঁটাপাহাড়ি বিস্ফোরণ সহ জঙ্গলমহলের একাধিক মামলায় নাম জড়ায় তার৷

২০১৫ সালের ১২ মে কাঁটাপাহাড়ি মামলায় মেদিনীপুর চতুর্থ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক কাবেরী বসু ছত্রধর সহ ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন৷ রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টে যায় অভিযুক্তরা৷ চলতি বছরের অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশকে খারিজ করে ছত্রধর সহ ৪জনের সাজার মেয়াদ কমিয়ে ১০ বছর করেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মুমতাজ খান ও জয় সেনগুপ্তর ডিভিশন বেঞ্চ৷ বেকসুর খালাস ঘোষণা করা হয় প্রসূন চট্টোপাধ্যায় ও রাজা সরখেলকে৷ ছত্রধর সহ ৪জনের সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে গত ২৫ সেপ্টেম্বর৷ বাকিদের জেলমুক্তি ঘটলেও পড়শি রাজ্যের মামলার জেরে ছত্রধরকে রাখা হয়েছে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে৷

লালগড়ের আমলিয়ায় ছত্রধরের বাড়িতে গিয়ে দেখা মেলেনি স্ত্রী নিয়তিদেবীর৷ সূত্রের খবর, শাসকদলের তত্ত্বাবধানে কলকাতায় রয়েছেন তিনি৷ কলকাতার কোথায় রয়েছেন, তা খোলসা করতে না চাইলেও নিয়তিদেবী খোলামেলা জানিয়েছেন, ‘‘গণ আন্দোলন করতে গিয়ে মিথ্যে মামলায় স্বামীকে জেলে যেতে হয়েছে৷ ভবিষ্যতে ও চাইলে রাজনীতি করবে, আমি বাধা দেব কেন?’’ যদিও প্রায় ১০ বছর ছেলেকে না দেখা মা মা বেদনা মাহাতো চান, জেলমুক্তির পর গ্রামে সাধারণ জীবন-যাপনই করুক তাঁর বড় সন্তান৷ অশীতিপর বৃদ্ধার কথায়, ‘‘ছেলে বাড়ি ফিরে এলে বলব- ওসব পার্টি আর করিসন না৷ ঘরে থাক, আগের মতো চাষবাস কর, শালপাতার ব্যবসা কর৷ অনেক শান্তিতে থাকবি৷’’

যদিও শাসকদলের নির্ভর়যোগ্য সূত্রের খবর, পড়শি রাজ্যের মামলায় জামিন মিললেই দলের বড় কোনও সমাবেশ মঞ্চ থেকে তৃণমূল নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটবে ছত্রধরের৷ শুধু লালগড় নয়, চার জেলার (মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া) তামাম জঙ্গলমহলে শাসকদলের দ্বায়িত্ব বর্তাতে পারে নিহত মাওবাদী স্কোয়া়ড সদস্য ছত্রধর মাহাতোর কাঁধেই৷ তবে ছত্রধরের হাত ধরে আগামীদিনেশাসক তৃণমূল জঙ্গলমহলের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে পারবে নাকি গেরুয়া উত্থান আরও বাড়বে- আপাতত এই জল্পনাতেই সরগরম লালগড়, থুড়ি জঙ্গলমহল৷