কাঠমান্ডু: শুরু হল চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক নেপাল সফর। ২৩ বছরের ব্যবধানে প্রথম কোনও চিনা রাষ্ট্রপ্রধানকে ফের বরণ করল নেপাল। কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে জিনপিং-কে স্বাগত জানালেন নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যাদেবী ভাণ্ডারি।

নেপালের রাজনৈতিক ঘটনাক্রমে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন মদন ভাণ্ডারি। তাঁর স্ত্রী বিদ্যাদেবী প্রেসিডেন্ট হতেই চিন থেকে এসেছিল বিশেষ শুভেচ্ছা। কাঠমাণ্ডুতে জিনপিং-কে স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠানে দুই প্রতিবেশী লাল সরকার শাসিত দেশের কূটনীতি-তে শুরু হল ভারতের রক্তচাপ ওঠা নামা।

যদিও নেপাল সফরের আগে ভারতে বেসরকারি ভিসিট করেই এসেছেন জিনপিং। তবে নেপাল-চিনের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। ২৩ বছর পর কোনও চিনা রাষ্ট্রপ্রধানের এটাই প্রথম নেপাল সফর। কূটনৈতিক মহলের প্রশ্ন, চিনা প্রেসিডেন্টের সফর ইঙ্গিত দিচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ভারতের প্রভাব কাটিয়ে দিতে মরিয়া নেপাল।

নেপালের নতুন সংবিধান তৈরির পর থেকেই চিনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়তে থাকে। এ নিয়ে চিন্তা বাড়ে নয়াদিল্লির। কাঠমান্ডু সফর করে তাতে প্রলেপ দিতে মরিয়া হন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু নেপালে ধুমায়িত হতে শুরু করেছে ভারতীয় প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার ইচ্ছে। এতে গতি লাগে ক্ষমতায় কমিউনিস্ট পার্টি আসতেই। প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি চিনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

নেপালের কূটনৈতিক অবস্থান:

এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর ও বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ হল ভারত ও চিন। তাদের মাঝখানে চরম ভৌগোলিক কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে রয়েছে নেপাল। কূটনীতির চালে নেপাল যে দিকেই বেশি ঝুঁকবে তার কড়া ফল পাবে অন্য পক্ষ।

প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির চিন সফর ও টানা কূটনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে নেপালে বিরাট পরিমাণ আর্থিক ও পরিকাঠামো বিনিয়োগের ডালি নিয়েই জিনপিং এলেন। গত ২৩ বছরের মধ্যে নেপালে কোনও চীনা প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম সফর। ১৯৯৬ সালে ঝিয়াং জেমিন কাঠমান্ডু সফর করেছিলেন। তার আগে ১৯৮৪ সালে চিনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেপালে এসেছিলেন লি জিয়ানিয়ান

ভারত-চিন টানাটানি:

কূটনৈতিক মহলের জল্পনা, দক্ষিণ এশিয়ায় যে কটি দেশের উপর ভারতের প্রভাব রয়েছে তার একটি হল নেপাল। সেই প্রভাব ভাঙতেই ২০১৫ সাল থেকে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বেজিং। এর মধ্যে নেপালের পটপরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতায় নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি। সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। বেড়েছে ভারতের প্রতি অসন্তোষ। যদিও নেপাল সরকার এখনও নয়াদিল্লিকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়। এই অবস্থায় নেপালের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজির জিনপিং।

নেপাল বিদেশ মন্ত্রক জানাচ্ছে, চিনা প্রেসিডেন্টের সফর হবে ১২ ও ১৩ অক্টোবর। সফরে প্রেসিডেন্ট জিনপিং নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হবে।

হিমালয় ভিত্তিক রেল যোগাযোগ:

চিনা প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের সফরে নেপাল-চিন ট্রেন যোগাযোগ বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এমনই জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ঈশ্বর পোখরেল। তিনি বলেছেন, এই রেললাইন স্থাপিত হলে নেপাল ও চিনের ট্রেন হিমালয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

বিরাট তথ্যপ্রযুক্তি বিনিয়োগ:

শুধু রেল সংযোগ নয়, তথ্য প্রযুক্তিতেও বিপুল বিনিয়োগ করতে নেপালের বাজারকে বেছে নিয়েছে চিন। সেই সঙ্গে নেপালের অভ্যন্তরীণ পেট্রোলিয়াম ব্যবসাতে আরও বেশি করে অংশ নেওয়া হবে বলেও খবর।

জিনপিংয়ের সফর ঘিরে কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে কাঠমান্ডুকে। নেপালি কমান্ডো বাহিনি প্রস্তুত। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির তরফে জানানো হয়েছে, চিনা প্রেসিডেন্টের এই সফর এক ঐতিহাসিক দিক নির্দেশ করবে। দুই প্রতিবেশী দেশ পরস্পরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলবে ভবিষ্যতে।