চিনা সেনার দাদাগিরি
file pic

তারক ভট্টাচার্য: ঘরে বাইরে স্নায়ুর চাপটা শেষমেষ আর সহ্য করতে পারল না বেজিং। লাদাখে গায়ের জোর দেখাতে গিয়ে বিনা উসকানিতে হামলা এবং তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে টেনে নিয়ে গেল চিনের পিপালস্‌ লিবারেশন আর্মি। যা আন্তর্জাতিকমহলে চিনের সাম্রজ্যবাদী চেহারা আরও উন্মুক্ত করে দিল।

১৯৭৫ সালের পরে এই প্রথম সীমান্ত বিবাদ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পৌঁছল, ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে আগেভাগেই চাপে থাকা বেজিং এখন বুঝতে পেরেছে কৌশলগত ভুলটা এবার তাঁদের হাত থেকেই হল। কারণ সীমান্ত বিবাদে আন্তর্জাতিকমহল বিশেষ করে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান সহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক আগে থেকেই ভারতের পাশে।

তার ওপর করোনা নিয়ে তথ্য গোপনের অভিযোগে আন্তর্জাতিকমহলে কাঠগড়ায় বেজিং। গোদের ওপর বিষফোঁড়া আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ যা কিনা আরও একটি ঠান্ডাযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এতো গেল বাইরের চাপ, ঘরেও হংকং ইস্যুতে চাপে চিনের্ কমিউনিস্ট সরকার। তাই সবদিক থেকে চাপে পড়ে এই প্রথম স্নায়ু ধরে রাখতে পারল না চিনা কমিউনিস্ট সরকার।

গালোয়ান ভ্যালির রক্তপাত নিয়ে আন্তর্জাতিকমহলে যে বেজিংকে প্রশ্নের মুখে পড়তেই হবে, তা আগেভাগে আঁচ করেই বেজিংয়ের সরকারি গণমাধ্যমগুলি তড়িঘড়ি আসরে নেমে পড়েছে। দাবি করতে শুরু করেছে ভারতীয় সেনা চিন সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়ার ফলে এটা হয়েছে।

সেক্ষেত্রে ভারতকে আগ্রাসক বলে অভিহিত করার চেষ্টা চলছে পুরোদমে। যদিও বেজিংয়ের সেই দাবি কোনওভাবেই ধোপে টেকে না কারণ, সীমানা পেরিয়ে ভারত ভূ-খণ্ডে ঢুকে বসে আছে চিন, ভারত নয়। আন্তর্জাতিকমহলও চিনের সাম্রজ্যবাদী চরিত্র সম্পর্কে অবহিত। তিব্বত এবং হংকংয়ের ইতিহাস ভুলে যায়নি বিশ্ব।

চিনের এই স্নায়ুর চাপ সহ্য করতে না পারার আরও একটি বড় কারণ, বদলে যাওয়া ভারতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই ভারত যে আগের ভারত নয় তা বেজিং ভাল করেই বুঝতে পারছে। এর আগে ডোকলাম দখল করতে এসে বাধার মুখে পড়তে হবে এবং পরে পিছু হঠতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি বেজিং।

অন্যদিকে ড্রাগনের আপত্তি সত্ত্বেও, ভারত ২৫৫ কিলোমিটারের রাস্তা-ব্রিজ তৈরি করে ফেলেছে নিয়ন্ত্রণরেখার সমান্তরাল বরাবর। তাই নিয়ন্ত্রণরেখার যে কোনও দুর্গম এলাকায় অতিদ্রুত সামরিক অস্ত্র, ট্যাঙ্ক নিয়ে এখন পৌঁছে যেতে পারে ভারতীয় সেনা।

প্রসঙ্গত, আরও কয়েক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি বাকি যা তৈরি হয়ে গেলে আকসাই চিনের একেবারে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলবে ভারতীয় সেনা। আর তা মরিয়া করে তুলেছে চিনকে। ফলশ্রুতি গোলোয়ান ভ্যালিতে চিনের অনুপ্রবেশ। এখানে বলে রাখা দরকার গোলায়ান উপত্যকা নিয়ে কোনও ঐতিহাসিক বিবাদ নেই। এলকাটি বিবাদহীনভাবেই ভারতের অংশ। এখানে আরও বলে রাখা প্রয়োজন, ভারত যে পরিকাঠামো এখন তৈরি করছে তেমনই কৌশলগত পরিকাঠামো নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর অনেক আগেই তৈরি করে ফেলেছে চিন। তাই নিয়ন্ত্রণরেখার এপারে ভারতের জন্যও এমন পরিকাঠামো অত্যন্ত প্রয়োজন।

লক্ষ্যনীয় হল কূটনৈতিক স্তরে বিষয়টি নিয়ে ভারত-চিন আলোচনার মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। স্বাভাবিকভাবেই চিনের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটছে। নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে অনুপ্রবেশ, ফাইটার জেট নিয়ে এসে, ব‌্যাপক সংখ্যায় সেনা মোতায়েন করেও ভারতের রাস্তা তৈরির কাজ থামানো যায়নি। আর তা মেনে নেওয়া কষ্টকর বেজিংয়ের পক্ষে। উল্টে সমসংখ্যক সেনা এবং অস্ত্র মোতায়েন করেছে ভারতও।

প্রতিরক্ষামন্ত্রকও স্পষ্ট করে দিয়েছে রাস্তা তৈরির কাজ যেমন চলছে তেমনই চলবে। তাই নিজেদের হাতের কাঠের পুতুল পাকিস্তানের পাশাপাশি এখন নেপালের কমিউনিস্ট সরকারকে হাত করে ভারতকে বিব্রত করছে চিন। কিন্তু এসব করেও যে কোনও লাভ হচ্ছে না, তাও বুঝতে পারছে বেজিং। তাই এবার রাতের অন্ধকারে ড্রাগন লাদাখে আরও একটু ভিতরে ঢুকে আসার চেষ্টা করতেই রুখে দাঁড়ায় ভারতীয় সেনা। খবর অনুযায়ী গুলি না চললেও পাথর এবং রোড নিয়ে সংঘর্ষ এমন জায়গায় পৌঁছায় যে দুই পক্ষের অনেকের মৃত্যু হয়।

ঘটনা ভারতকে যতটা না বেশি আশ্চর্য করেছে চিনের কাছে আরও বেশি আশ্চর্যের। কারণ এতদিন তাঁরা মনে করে এসেছে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে কড়া মনোভাব নিয়ে থাকলেও চিনের সঙ্গে তা করা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়, বেজিংয়ের ধারণা ছিল কূটনৈতিক স্তরে যাই হোক একেবারে সরেজমিনে সামন্য বলপ্রয়োগেই ভারত পিছু হঠবে। কিন্তু ড্রাগনের এই ধারণা যে আসলে একটা মিথ তা প্রমাণ করে দিয়েছে নয়াদিল্লি।

যুদ্ধের পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। এটাও ঠিক যে যুদ্ধ কোনওভাবেই চায় না বেজিং। পরিস্থিতি সেই দিকে যাক তা চায়না নয়াদিল্লিও। এক্ষেত্রে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য যেমন একটা বিষয়। তেমনই দুই পরমাণু শক্তিধর বড় দেশের যুদ্ধে যাওয়া কতটা মারত্মক হতে পারে তা বলার অবকাশ রাখে না। এছাড়াও বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় ২০৩০ এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে প্রথম স্থান দখল করার স্বপ্ন দেখছে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ জিনপিংয়ের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। তাই সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেনা বেজিং।

অন্যদিকে ইতিহাসে এই প্রথম চিন ইস্যুতে ভারত স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, ভারত পৃথিবীর কোনও দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত করে না এবং পৃথিবীর কোনও দেশ ভারতের সার্বভৌমত্বে আঘাত করার চেষ্টা করলে তা সহ্য করা হবে না। নয়াদিল্লির এমন স্পষ্ট বার্তা বেজিং আশা করেনি।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারাকে বিলুপ্ত করে লাদাখকে আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষিত করাও ভালোভাবে নেয়নি বেজিং, কারণ চিন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর গিয়েছে পাক এবং চিন অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে। এই করিডরে সায় নেই নয়াদিল্লির। তাই সবদিক বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় স্পষ্ট যে এই ভারতকে দেখতে অভ্যস্ত নয় চিন আর তারজন্যই খানিকটা মরিয়া হয়েই কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে চিন। যা আন্তর্জাতিকমহলে চিনকে আরও সমালোচনার মুখে ফেলবে।

ফলে এখনই আরও দ্রুততার সঙ্গে কূটনৈতিকভাবেই ভারতের সঙ্গে ড্যামেজ কন্ট্রোলের পথে হাঁটবে বেজিং। সেই দিকে তড়িঘড়ি হাঁটতেও শুরুও করেছে বেজিং। নয়াদিল্লিরও অবস্থানও স্পষ্ট, যে কোনও বিতর্কের সমাধান আলোচনার টেবিলেই চাইছে ভারত কিন্তু ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে সেটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তাই ড্রাগন চাইলে হাতি একসঙ্গে নাচতে প্রস্তুত, কিন্তু ড্রাগন বিষ ছড়ালে হাতি তাকে শুঁড়ে তুলে আছাড় মারবে সেটাও স্পষ্ট।

তারক ভট্টাচার্য, লেখক পরিচিতি– গত কয়েক বছর ধরে এক বহুজাতিক মার্কিন সংস্থায় অ্যানালিস্ট হিসেবে নিযুক্ত। এছাড়া এর আগে প্রায় দশ বছর মূল ধারার সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক স্পেশাল পেপার নিয়ে পড়াশোনা।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ