প্রসেনজিৎ চৌধুরী: বছর ঘুরে আসে। হাজারে হাজারে মানুষ জড়ো হন সমাধিস্থলে। শ্রদ্ধা জানান তাঁরা। দেশের প্রথম এক মার্কসিস্ট সরকারের প্রেসিডেন্ট আলেন্দে-কে। তীব্র কূটনৈতিক ও সামরিক ষড়যন্ত্রে শেষ হয়েছিল চিলির প্রথম বামপন্থী সরকারের জীবন।

তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন ? নাকি তাঁকে খুন করা হয়েছিল? লাখ টাকার এই প্রশ্নের উত্তর এখনও রহস্যে মোড়া। যাইহোক সেও ছিল এক ভয়ানক ৯/১১ দিন।

তবে ২০০১ সালের সেই ভয়াবহ টুইন টাওয়ার বা পেন্টাগনের উপর আল কায়েদা হামলা নয়। যদিও এই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে সবথেকে বেশি আলোচিত। কিন্তু তারও আগে ১৯৭৩ সালে ঘটেছিল বিশ্বজোড়া হই হই ফেলে দেওয়া কাণ্ড।

ঘটনাস্থল চিলি। দক্ষিণ আমেরিকা। ফুটবল পাগল অপূর্ব সুন্দর দেশটির অপর সম্পদ তামার খনি। আর দুরন্ত শ্রমিক।

বরাবরই তীব্র গণ আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি চিলি। তামার খনিতে মার্কিন সংস্থাগুলির কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সবসময় তৎপর থাকে ওয়াশিংটন। সেই মতো নিজেদের পছন্দের সরকার তাদের দরকার। তারই বিরুদ্ধে বারে বারে আন্দোলন হয়েছে। আর সেই আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইএ প্রতিবারই সফল হয়েছে।

এই নীতির বিরুদ্ধে জনরোষ ও আন্দোলনে রাজধানী সান্তিয়াগোর রাজপথ হয়েছে উত্তাল। কিন্তু কিছুতেই আমেরিকাপন্থী সরকারকে হটানো সম্ভব হয়নি। প্রতিবারই চিলির জাতীয় নির্বাচনে সিআইএ তার অপূর্ব কূটনৈতিক কৌশল দেখিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে বাজিমাত করে আসছিল।

যাবতীয় পরিস্থিতি আমূল বদলে যায় ১৯৭০ সালে। চিলির ক্ষমতায় উল্কার মতো চলে আসেন সালবাদোর আলেন্দে (আইয়েন্দে)। মার্কসবাদী এই নেতা ত্রিমুখী লড়াইয়ে অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়ে চিলির প্রেসিডেন্ট হন।

সেই নির্বাচনে ব্যর্থ হয় সিআইএ কূটকৌশল। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে কড়া ধমক খান দুঁদে মার্কিন গোয়েন্দা কর্তারা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টে তৎকালীন চিলিতে মার্কসবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা তীব্র আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। এদিকে ধমক খেয়ে নতুন উদ্যমে চিলির সরকার পতনের যাবতীয় পরিকল্পনা নতুন করে সাজায় সিআইএ।

শুরু হয় চিলিতে সরকার ফেলে দিতে সামরিক অভ্যুত্থানের ছক।

প্রেসিডেন্ট হয়েই আলেন্দে প্রথম তামার খনির জাতীয়করণের পথ নেন। মাথায় হাত পড়ে যায় আমেরিকার।  গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়, চিলির মার্ক্সসিস্ট সরকারের সঙ্গে কিউবা ও চিনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন কিউবা বরাবরই তীব্র মার্কিন বিরোধী অবস্থান নেয়। খোদ চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে ও কাস্ত্রোর বৈঠক দুনিয়া জুড়ে ঝড় তুলে দেয়।

বেগতিক বুঝে যায় সিআইএ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চূড়ান্ত নির্দেশ আসতেই শুরু হয় সরকার ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা। এই কাজে সিআইএ-কে সাহায্য করে চিলির সেনা কর্মকর্তা আউগস্তো পিনোচেত (পিনোশে)। চিলিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র আপত্তি থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনওভাবেই অবস্থান বদল করেনি।

রক্তাক্ত সংঘর্ষে চিলি আন্দোলিত হতে থাকে। মার্কিসবাদী সরকার ও মার্কিনপন্থী সেনার লড়াইয়ে ক্রমে কোণঠাসা হতে থাকেন প্রেসিডেন্ট আলেন্দে। শুরু হয় তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরবর্তী ছক।

আরও এক ৯/১১:

১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। চিলিতে ঘটে যায় সরকার বিরোধী অভ্যুত্থান। সেনা কর্মকর্তা পিনোচেতের নির্দেশে প্রেসিডেন্টের বাসভবনেই বন্দি হন আলেন্দে। তবে কোনওভাবেই নতি স্বীকার করতে রাজি হননি। তিনি বুঝতে পারছিলেন লড়াই চালানো সম্ভব নয়। ১১ সেপ্টেম্বরই সব শেষ হয়। প্রেসিডেন্ট আলেন্দের মৃত্যু ঘোষণা করা হয়।

এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আরও আলোড়ন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চিলির রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিযুক্ত করা হয়। তবে ওয়াশিংটন সেই অভিযোগ উড়িয়ে দেয়। আরও পরে বিভিন্ন তদন্তমূলক রিপোর্টে প্রকাশ হয়, রক্তাক্ত সেই ৯/১১-তে মার্কিন সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা।

সেদিন কি মার্কসবাদী প্রেসিডেন্ট আলেন্দে-কে খুন করা হয়েছিল? মেলেনি উত্তর। তবে এও প্রচারিত তিনি আত্মসমর্পণ না করতে চেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। গোপনে তাঁর মরদেহ কবর দেওয়া হয়।

১৯৯০ সালে সেই সমাধি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। চিলি সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আলেন্দের সমাধি নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।