নিখিলেশ রায়চৌধুরী

‘তারামা-র স্বপ্নাদেশ’ পেয়েই নাকি চার বছরের প্রীতিকে অমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল৷পুলিশি জেরায় এ কথা কবুল করেছে তার ঠাকুমা৷ যাঁরা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ একটি ‘সচেতন’ রাজ্য, এখানে শিক্ষিত এবং সুরুচিশীল ও সংস্কৃতিপরায়ণ মানুষের সংখ্যা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে বেশি, প্রীতির ভয়াবহ পরিণাম তাঁদের চোখে আঙুল দিয়ে রূঢ় বাস্তবটা দেখাতে পারবে কি না জানি না৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

হয়তো বিস্তীর্ণ বাংলা জুড়েই ফুলের মতো অনেক ‘প্রীতি’-কে হররোজ তন্ত্র-যন্ত্র-মন্ত্রের পৈশাচিকতা ও বীভৎসার শিকার নানাভাবে হতে হচ্ছে৷খবরে আসছে না, পুলিশ জানতে পারছে না, অতএব আমরাও নিশ্চিন্ত, পশ্চিমবঙ্গ একটি ‘সচেতন’ রাজ্য! কারুকাজ-করা পাঞ্জাবি এবং ইলিশ মাছ ভাজাতেই তো আমরা অনেক বেশি সাবলীল, ছুটির দিনে ইটিং আউট কিংবা আকাদেমি-গিরিশ মঞ্চে গ্রুপ থিয়েটারের নাটক, বাঃ! এর মধ্যে আবার ওই প্রীতি-টিতি কেন?

ঠিক, প্রীতির মৃত্যু আর দশটা খবরের মতোই একটা খবর মাত্র৷Of course, horrible crime! সেই জন্যই তো নিউজ টিভি চ্যানেলগুলোয় ঘটনাটির অত vivid description দেওয়া হচ্ছে বারংবার৷ দেখছেন না? আমরা তো দেখছি৷ ইসস, কী কাণ্ড না! এই রে, এবার ‘গোয়েন্দা গিন্নি’ শুরু হবে, ঘোরা, ঘোরা!

হ্যাঁ, প্রীতির খবর আর চারটে interesting খবরের মতোই আর একটা চাটনি৷এর সঙ্গে আবার ‘সচেতনতা’ ইত্যাদি টেনে আনা কেন? সুযোগ পেলেই হুল ফোটানো আপনার মজ্জাগত নাকি মশায়!

তা বটে৷ কারও কারও স্বভাবই অমন৷ পায়ে পা বাধিয়ে ঝগড়া করা৷ তবে একটু অবাক লেগেছিল দু’-তিন বছর আগে কলকাতা বইমেলার একটি স্টলে রাশি রাশি ‘বৃহৎতন্ত্রসারে’র নতুন ঝকঝকে সংস্করণ দেখে৷এ কি বাঙালি পাঠকের পুরাতনী ও ঐতিহ্যের প্রতি কৌতূহলের ফসল, নাকি এক সময়কার বাংলার যন্ত্রযোগে তন্ত্রসাধনা ও মারণ-উচাটনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে নতুনকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা?

সেই বাংলা, যেখানে অন্ধকারের রাজত্ব সত্যি সত্যিই থাবা গেড়েছিল৷সাধারণ মানুষ কাটাত ত্রাসে-আতঙ্কে৷ বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার নামে বজ্রযানী বা শূন্যবাদীদের Bacchanalia, Lovecraftian horror আর সনাতন ধর্ম রক্ষার নামে কাপালিক তান্ত্রিকদের vampire-like রক্তপিপাসা-জিঘাংসা কিংবা গোঁসাইদের মঠকেন্দ্রিক অবাধ ব্যভিচার এবং সেসবের প্রতি শাসককুলের প্রচ্ছন্ন অথবা ঘোষিত সমর্থন, এই বাংলার পুনরুজ্জীবনই কি আমাদের নতুন করে কাম্য? সেই বাংলা, যেখানে ইসলামের আগমনকে আশীর্বাদ বলে ধন্য ধন্য করে গিয়েছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো বিদ্বজ্জন৷পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার ছোঁয়াচ ও সেইসঙ্গে আধুনিকতার আলেয়ায় আমরা ধরেই নিয়েছি, সেসব দিন গিয়াছে৷ভুলতে চেয়েছি যে, আমাদের inner-darkness সুপ্ত থাকতে পারে, কিন্তু মরতে চায় না৷অন্ধকার চোরাগলি বেয়ে ইঁদুর-মূষিক কিংবা সাপের মতো সে গুটি গুটি এগনোর রাস্তা খোঁজে৷আর সুযোগ পেলেই ‘প্রীতি’-র মতো ফুলগুলিকে ছিন্নভিন্ন করতে চায়৷

কঠিন বাস্তব এটাই, বিশ্বের বহু জায়গার মতো এই বাংলাতেও গুপ্তবিদ্যার প্রতি এক শ্রেণির মানুষের কৌতূহল নিছক জানতে চাওয়ার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়৷তারা ভাবে এবং বিশ্বাস করে, এই বিদ্যা আয়ত্ত করতে পারলে তুড়ি মারলেই মিলবে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ৷ চোখের নিমেষে চতুর্বর্গ লাভ৷আর সে কারণেই বার বার দেখা দেয় প্রীতিদের জীবন নেওয়ার ‘গোপন হিংসা, কপট রাত্রিছায়ে’৷

তবে, এখনও সময় আছে৷পশ্চিমবঙ্গে যদি মহারাষ্ট্রের মতো কুসংস্কার ও তন্ত্রাচার দমন আইন পাশ হয়, তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও প্রীতিদের জন্য একটা safeguard গড়ে তোলা সম্ভব হবে৷মহারাষ্ট্রের নজির অনুসরণ করে কর্ণাটকও এমন একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে৷পশ্চিমবঙ্গও যদি সেই একই পথে হাঁটে তাহলে অন্তত আশা করা যাবে, এই রাজ্যের বর্তমান শাসককুল অন্তত সত্যি সত্যিই ‘সচেতন’ হতে চাইছে৷আমরা কোন পশ্চিমবঙ্গ চাই? ‘বৃহৎতন্ত্রসারে’র ভজনামগ্ন বঙ্গ, নাকি ডিরোজিও-র আলোয় আলোকিত ‘ইয়ং বেঙ্গল’?