শংকর দাস, বালুরঘাট: সকাল থেকে ঘটা করে দেশ জুড়ে যথাযথ শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হল স্বামী বিবেকানন্দের ১৫৬তম জন্ম দিবস। গত ১১ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে স্বামীজীর শিকাগো মহাধর্ম সভায় বক্তৃতার স্মরণীয় দিবসেরও। ১৮৯৩ সালের ওই দিন আমেরিকার শিকাগোর শহরের গ্র‍্যান্ট পার্ক এলাকায় অবস্থিত ‘আর্ট ইন্সটিটিউট অফ শিকাগো’র অডিটোরিয়ামে বিশ্বজয়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

সেদিন বিবেকানন্দের গলায় ছিল সমগ্ৰ হিন্দু নরনারীর কণ্ঠস্বর। সর্বধর্ম মহাসভায় উপস্থিত শ্রোতাদের বিশেষ করে আমেরিকানরাও এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে পরদিন সেই দেশের সমস্ত সংবাদপত্রে তাঁর ছবি ও ছবির নীচে ক্যাপশন ছিল ‘দ্য হিন্দু মঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, দ্য সাইক্লনিক অফ হিন্দু।’ কিন্তু সেদিন ওই অবধিই। পরবর্তীতে শিকাগোর সেই অডিটোরিয়ামে বিশ্ববন্দিত স্বামী বিবেকানন্দের কোন স্মৃতিই সেখানে রাখেনি। অথচ এই রাজ্যে বাঙালীরা ও দেশের অন্যান্য প্রান্তের অনেকেই বিভিন্ন কাজে বা প্রয়োজনে আমেরিকায় গিয়ে স্বামীজীর বিশ্বজয়ী বক্তৃতার পীঠস্থান শিকাগোর সেই আর্ট ইন্সটিটিউটের বিল্ডিংটি দর্শন করতে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁদের প্রত্যেকেই হতাশ হয়ে ফিরে আসেন।

যুগপুরুষ বিবেকানন্দের ১৮৯৩ সালের বক্তৃতা আজও বাঙ্গালি তথা ভারতবাসীরা গর্বের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করে থাকেন। যে বক্তৃতার শুরুটাই ছিল ‘সিস্টার্স এন্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা।’ যার অনুরনণ আজও সকল ভারতবাসীর কানে হয়ে চলেছে। স্বামীজীর প্রতি শ্রদ্ধা ও গর্বে শিকাগো বেড়াতে গিয়ে অন্যরকমের অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরে এলেন বালুরঘাটের আশিষ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী রাখী চট্টোপাধ্যায়। শহরের কলেজ পাড়ায় বাড়ি চট্টোপাধ্যায় দম্পতির একমাত্র পুত্র ও পুত্রবধূ দুইজনেই আমেরিকার গবেষণার কাজ করেন।

গত বছর আগস্টে দুই মাসের জন্য সস্ত্রীক আশিষ বাবু পুত্র বউমা ও নাতির সঙ্গে সময় কাটাতে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। তাঁদের স্বপ্ন ছিল শিকাগোর সেই বিশ্বধর্ম মহাসভার অডিটোরিয়াম দর্শন করবেন ও মাথায় সেখানকার মাটি ঠেকাবেন। সেই মোতাবেক গতবছর ২ সেপ্টেম্বর সকলে মিলে তাঁরা শিকাগোতে চলেও যান। কিন্তু আর্ট ইন্সটিটিউট বিল্ডিং দর্শনে গিয়ে হতাশ হতে হয়েছে তাঁদের।

সেখানে কোথাও স্বামীজীর সম্পর্কে কিছু লেখা তো দূর৷ সেখানে কোনও বিশ্বধর্ম সম্মেলনের মহান বক্তার নাম লেখা নেই। ভিতরে কোথাও অথবা এই বিষয়ে কোনও বই সেখানকার লাইব্রেরিতে থাকতে পারে৷ এইভাবে সেদিন চট্টোপাধ্যায় পরিবার আর্ট ইন্সটিটিউটের অফিস কাউন্টারে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন৷ সেখানে কর্মীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন সেরকম কিছুই নেই। স্বাভাবিক কারণের বুক ভরা ব্যথা নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাঁদের।

দেশ স্বাধীন পর ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের সরকারই খোঁজ নিয়ে দেখেনি যে ‘আর্ট ইন্সটিটিউট অফ শিকাগো’র অডিটোরিয়ামে স্বামীজীর নামে কোন কর্নার গ্যালারি বা কোন ফলক রয়েছে কিনা। আগের সরকার যেমন তেমন কেন্দ্রের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার আমেরিকা সফর সেরেছেন। সেই দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সহ অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গেও বিভিন্ন আলোচনায় একাধিকবার মিলিত হয়েছেন।

শনিবার স্বামীজীর ১৫৬ তম জন্মদিনে আশিষ চট্টোপাধ্যায় অভিযোগের সুরে জানালেন, স্বামীজীর মহান কীর্তিগুলির অন্যতম শিকাগো মহা ধর্মসভায় বক্তৃতার মাধ্যমে ভারতের সনাতন ভাবনাকে তুলে ধরা। যেটিকে স্মরণে রেখে প্রতিবছর ১১ সেপ্টেম্বর দিনটিকে পালনও করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই অনেক আশা নিয়ে শিকাগোর সেই পুণ্যভূমি দর্শন করবেন বলে আমেরিকা তাঁরা গিয়েছিলেন। কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় যে সেখানে স্বামীজীর নামে কিছুই নেই। সামান্য একটা ফলকও নেই।

অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রীরা বহুবার আমেরিকায় গিয়ে নানান বিষয়ে আলোচনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসেছেন। তাঁদের অন্তত উচিত ছিল এই বিষয়ে আমেরিকা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার। এদিন তিনি বিষয়টিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন করবেন। যাতে তিনি দিল্লীর মাধ্যমে শিকাগোর সেই আর্ট ইন্সটিটিউট বিল্ডিং-এ স্বামী বিবেকানন্দ তথা ১৮৯৩ সালের সেই বিশ্বধর্ম সম্মেলনের স্মরণে কিছু নিদর্শন সেখানে যেন স্থাপন করানো হয়।