সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি পারফেক্সনিস্ট ছিলেন। সঠিকভাবে চরিত্রে ফুটে না ওঠা পর্যন্ত বা সঠিক ‘এক্সপ্রেশন’ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কিছুতেই ‘শট ওকে’ করতেন না। তাঁর সিটি লাইটস ছবিতে অভিনেত্রী ভার্জিনিয়া চেরিলের মাত্র দুই শব্দের ডায়ালগ তিনি ৩৪২তম বারে গিয়ে ‘ওকে’ করেছিলেন। নিজের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই থাকত। কিন্তু সেই তিনিই একবার নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে গিয়েছিলেন। নিজের নকল নিজেই ঠিক মত করতে পারেননি। অন্তত বিচারকদের মতে তেমনটাই ছিল। তিনি চার্লি চ্যাপলিন।

ঘটনাটা ১৯১৫ সালের। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোয় আয়োজন করা হয়েছিল একটি প্রতিযোগিতার। চার্লি চ্যাপলিনের ট্র্যাম্প চরিত্রটিকে সবথেকে ভালভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে। যে পারবেন তিনিই হবেন চ্যাম্পিয়ন। সোজা হিসেব। বিশ্বের বহু স্থানেই এমন অনেক প্রতিযোগিতা তখন হত। চ্যাপলিন তখন এতটাই বিখ্যাত ছিলেন। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার, সান ফ্রান্সিসকোর ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন চ্যাপলিন নিজেই। একদম ছদ্মবেশে। কেউ বুঝতেও পারেনি যে প্রতিযোগীদের তালিকায় তিনিও উপস্থিত। চ্যাপলিন মঞ্চে আসেন, ট্র্যাম্পের চরিত্রটি নকল করে দেখান। কিন্তু এর পরের ঘটনা বেশ চমকপ্রদ।

ফলাফল দেখে চ্যাপলিনের চক্ষুই চড়কগাছ। প্রতিযোগিতায় তিনি নিজেই তৃতীয় হয়েছেন। কেউ কেউ দাবী করেন, তিনি নাকি ফাইনাল রাউন্ডেই পৌঁছতে পারেননি।

চ্যাপলিন লন্ডনে প্রচণ্ড দারিদ্র ও কষ্টের মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত করেন। শৈশব থেকেই শিশুশিল্পী হিসেবে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রঙ্গশালায় অভিনয় করতেন তিনি। পরে একজন মঞ্চাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতা হিসেবে অভিনয় শুরু করেন। ১৯ বছর বয়সে তিনি স্বনামধন্য ফ্রেড কার্নো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এঁদের সঙ্গেই চ্য়াপলিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি সেখানে হলিউডের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১৪ সালে কিস্টোন স্টুডিওজের হয়ে বড় পর্দায় অভিনয় শুরু করেন চ্যাপলিন। অচিরেই তিনি তাঁর নিজের সৃষ্ট ভবঘুরে ‘দ্য ট্রাম্প’ চরিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন এবং তার অনেক ভক্তকূল গড়ে ওঠে।

ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালে “শার্লট” নামে পরিচিত চ্যাপলিনের ট্রাম্প ভবঘুরে হলেও ব্রিটিশ ভদ্রজনোচিত আদব-কায়দায় সুসংস্কৃতি এবং সম্মানবোধ এই চরিত্রে অটুট। শার্লটের পরনে চাপা কোট, সাইজে বড় প্যান্ট, বড় জুতো, মাথায় বাউলার হ্যাট, হাতে ছড়ি আর অদ্বিতীয় টুথব্রাশ গোঁফ।

চ্যাপলিন শুরুর দিক থেকেই তাঁর চলচ্চিত্রগুলো পরিচালনা করতেন এবং পরবর্তীতে এসানে, মিউচুয়াল ও ফার্স্ট ন্যাশনাল কর্পোরেশনের হয়েও চলচ্চিত্র পরিচালনা চালিয়ে যান। ১৯১৮ সালের মধ্যে তিনি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেন।

১৯১৯ সালে তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড আর্টিস্ট্‌স গঠন করেন, যার ফলে তিনি তার চলচ্চিত্রের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। তাঁর নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হল ‘দ্য কিড’ (১৯২১)। পরবর্তীতে তিনি ‘আ ওম্যান অব প্যারিস’ (১৯২৩), ‘দ্য গোল্ড রাশ’ (১৯২৫) এবং ‘দ্য সার্কাস’ (১৯২৮)-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং এসব চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেন। ১৯৩০ এর দশকে তিনি সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এবং নির্বাক ‘সিটি লাইট্‌স’ (১৯৩১) ও ‘মডার্ন টাইমস’ (১৯৩৬) নির্মাণ করে প্রশংসিত হন। চ্যাপলিনের পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ (১৯৪০) অতিমাত্রায় রাজনৈতিক। এখানে তিনি আডলফ হিটলারকে অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে আনেন। আজও এই ছবি অন্যতম সেরা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার।

পরবর্তীকালে তিনি তাঁর ট্রাম্প সত্তা বিসর্জন দেন এবং মঁসিয়ে ভের্দু (১৯৪৭), লাইমলাইট (১৯৫২), আ কিং ইন নিউ ইয়র্ক (১৯৫৭) এবং আ কাউন্টেস ফ্রম হংকং (১৯৬৭) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৭২ সালে তাঁকে অ্যাকাডেমি সম্মান প্রদান করা হয়। শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাঁকে ফ্রান্স সরকার ১৯৭১ সালে লেজিওঁ দনরের কমান্ডার ও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯৭৫ সালে নাইটহুডে ভূষিত করেন। মৃত্যুর পরও চ্যাপলিন তার নির্মিত দ্য গোল্ড রাশ, সিটি লাইট্‌স, মডার্ন টাইমস ও দ্য গ্রেট ডিক্টেটর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন। এই চলচ্চিত্রগুলোকে মার্কিন চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা ছবির তালিকায় আজও আগের মতোই জ্বলজ্বল করছে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.