তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: টানা এক মাসের বিরতি। তার পর জৈষ্ঠ্য মাস থেকেই ফের ঘুরতে শুরু করে কুম্ভকার সম্প্রদায়ের মৃৎশিল্পের অন্যতম হাতিয়ার চাকা। প্রাচীন প্রথানুযায়ী চৈত্র সংক্রান্তির পর থেকে পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে বন্ধ থাকে কুমোর পাড়ার মাটির কাজ। তখন আর কুমোরের চাকা ঘোরে না। তৈরি হয় না কোন ধরণের মাটির জিনিসপত্র। দীর্ঘ এক মাস বিশ্রামের পর জ্যৈষ্ঠ মাসের কোন এক বিজোড় শনিবারে কুমোরের চাকাতে বিশেষ পুজা পাঠের মধ্য দিয়ে নতুন করে শুরু হয় মাটির কাজ।

‘টেরাকোটার গ্রাম’ বলে পরিচিত বাঁকুড়ার তালডাংরার পাঁচমুড়া গ্রামের পেশায় মৃৎ শিল্পী তাপস কুম্ভকার বলেন, ‘বংশ পরম্পরায় আমাদের এই প্রথা চলে আসছে। সারা বছর কাজ শেষে একমাসের টানা বিশ্রাম। যে চাকা দিয়ে কুমোরেরা মাটির বিভিন্ন ধরণের জিনিসপত্র তৈরি করেন সেই চাকার পুজোর মধ্যেও বৈচিত্রের ছোঁয়া।

কিভাবে হয় এই পুজো? মৃৎশিল্পী তাপস কুম্ভকারের কাছে এই প্রশ্ন রাখতেই তিনি বলেন, ওই চাকাটিকে শিবজ্ঞানে পুজা করা হয়। চৈত্র মাসের ২৮ তারিখে ওই চাকাটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তার মাথায় বেশ কিছুটা মাটি বসিয়ে এক পাক ঘোরানো হয়। এভাবে ঘোরার ফলে ওই মাটি একটি শিব লিঙ্গের আকার ধারণ করে। এই অবস্থায় পুরো বৈশাখ মাস রেখে দেওয়া হয়। পরে জ্যৈষ্ঠ মাসের কোন এক বিজোড় শনিবার সেই শিব লিঙ্গের আকৃতি বিশিষ্ট মাটিকে সুন্দর করে সাজানোর পর কুলো পুরোহিত ডেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পুজো করা হয়। এর পর থেকেই সারা বছরের প্রয়োজনীয় মাটি সংগ্রহের কাজ তারা করেন’ বলে তিনি জানান।

‘টেরাকোটার দেশ’ পাঁচমুড়ার কুমোর পাড়ায় বর্তমানে ৭০ টি পরিবারের কয়েকশো মানুষ এই পেশায় সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। এদিন এই গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, চাক বা চাকা পুজো ঘিরে পুরো গ্রাম জুড়ে উৎসবের পরিবেশ। এক দিকে সাউণ্ড বক্স বাজছে, অন্যদিকে সুন্দরভাবে আলপনা আর ফুল আর পাতা দিয়ে সাজানো হয়েছে চাকাটিকে। কুলপুরোহিত বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে শিবজ্ঞানে ঐ চাকার পূজো করছেন। সব মিলিয়ে এদিন উৎসবের মেজাজ পুরো পাঁচমুড়া জুড়ে।

এদিন পাঁচমুড়ার পাশাপাশি বিবড়দাতেও মহাসমারোহে ‘চাক পুজা’ বা ‘চাকা পুজো’ অনুষ্ঠিত হল। বছরের এই বিশেষ দিনটি তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্রের বলে মনে করেন কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এই গ্রামের সুচাঁদ কুম্ভকার বলেন, এক মাসের বিরতি শেষে এই তপ্ত জ্যৈষ্ঠ আবারো শুরু হবে মাটির কাজ। যেহেতু জৈষ্ঠ্য মাসের কোন বিজোড় শনিবারে এই পুজো করার নিয়ম, তাই সাধারণভাবে মাসের প্রথম বিজোড় শনিবারকেই তারা বেছে নেন বলে তিনি জানান৷

বিশিষ্ট শিক্ষক ও পাঁচমুড়া গ্রামের মৃৎশিল্পী বিশ্বনাথ কুম্ভকার বলেন, কুমোর পাড়ায় এই রীতি দীর্ঘদিনের। একাধারে এই শিল্পের সঙ্গে মানুষরা সারা বছর নিরবিচ্ছিন্ন কাজ করার পরে ওই একটা মাস বিশ্রামের সুযোগ পান। অন্যদিকে নতুন বছরে যার সাহায্যে মূলত জীবিকা নির্বাহ হয় সেই চাকাটিকে দেবজ্ঞানে পুজো করা হয়। মৃৎ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা এই সময় চেষ্টা করেন কাজের চাপে সারা বছর সেভাবে যে সমস্ত আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়না তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরী করার। এছাড়াও সাধারণভাবে এই মাসেই পারিবারিক নানান সামাজিক অনুষ্ঠান তারা সেরে ফেলেন বলেই তিনি জানিয়েছেন।