প্রসেনজিৎ চৌধুরী: প্রশ্নটা উঠছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই৷ প্রশ্নটার উত্তর মেলেনি এখনও৷ কারণ ভবিষ্যৎ ভুটানের বিদেশনীতি নিয়েই ধোঁয়াশা দেখা দিচ্ছে৷ নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তথা ডিএনটি দলের প্রধান বাংলা জানা লোটে শেরিং তাঁর দেশে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস তৈরিতে আগ্রহী৷ তবে রাজার অনুমতি নিয়েই সেটা করতে চান৷ এর থেকে প্রশ্ন উঠছে থিম্পুতে কি এবার চিনা দূতাবাস খুলতে চলল ? দীর্ঘদিন থেকে বেজিংয়ের তরফে তীব্র ইচ্ছা রয়েছে ভারতের একদম নাকের ডগায় নয়াদিল্লির ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভুটানে দূতাবাস স্থাপন করার৷

এই দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হলেন লোটে শেরিং৷ মধ্য-বামপন্থী নেতা বাংলা জানেন৷ কারণ এমবিবিএস পড়ার জন্য দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ও ঢাকায় কাটিয়েছেন৷ বাংলায় তিনি বেশ সড়গড় সেটা জানিয়েছে ভুটানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশি বন্ধুরাই৷ ফলে পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া ভুটান দেশটি এবার এমন এক প্রধানমন্ত্রী পেল যিনি এই রাজ্যের ভাষাও পরিষ্কার বুঝতে পারেন৷

থিম্পু থেকে প্রকাশিত ভুটানি দৈনিক ‘কুয়েনসেল’ জানাচ্ছে, সাধারণ নির্বাচনে ড্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন৷ সে দেশের সংসদের ৪৭টি আসনের মধ্যে ডিএনটি পেয়েছে ৩০টি। আর ড্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) পেয়েছে ১৭টি আসন। তারাই হবে বিরোধী দল। সদ্য ক্ষমতা হারানো পিডিপি সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক রাউন্ডেই পরাজিত হয়৷ তখনই ক্ষমতা ছেড়ে দেন শেরিং টোবগে৷ যিনি নিজে বরাবরই ভারতপন্থী হিসেবেই পরিচিত৷

শেরিং টোবগের পরাজয়ের পর থেকেই চিন-ভুটান সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছিল৷ পশ্চিমবঙ্গ, অসম, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যের সঙ্গে ভুটানের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে৷ আবার অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে রয়েছে চিনের সীমান্ত৷ উত্তরে চিন এবং দক্ষিণে ভারতের মতো দুটি পরমাণু শক্তি সম্পন্ন বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশের মাঝখানে অবস্থান ভুটানের৷ সামরিক কৌশলগত কারণে এই দেশ খুবই গুরুত্ব পায় নয়াদিল্লির কাছে৷ ১৯৪৯ সালে ভারত-ভুটান ‘বন্ধুত্বের চুক্তি’ অনুসারে থিম্পুর সবসময়ের বন্ধু নয়াদিল্লি৷

পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার ও কালিম্পং জেলা লাগোয়া ছোট্ট দেশ ভুটান৷ সেখানকার প্রধানমন্ত্রী পদে বসতে চলা ডক্টর লোটে শেরিং আগেই জানিয়েছেন, তার সরকার আগামী পাঁচ বছর ভারত-চিন এই দুই দেশের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলবে৷ তবে থিম্পুতে চিনের দূতাবাস চালুর পক্ষেই তিনি৷ তবে বিদেশ নীতির বিষয়ে চূড়ান্তে নির্দেশ দেবেন রাজা জিগমে খেসর নামগিয়াল ওয়াংচুক। টানা ১০ বছর বাংলাদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কাটানো লোটে শেরিংয়ের এমন বয়ানে তৈরি হচ্ছে ধোঁয়াশা৷

২০১৩ সাল থেকে রাজনীতিতে অংশ নিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসা লোটে শোরিং তাই এখন বেজিং ও নয়াদিল্লির কাছে বিশেষ প্রিয়৷

কারণ ভুটান সীমান্তবর্তী পশ্চিমবাংলার আলিপুরদুয়ার জেলা ও দার্জিলিং জেলার অত্যন্ত কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান৷ সেনা বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই মত বিখ্যাত শিলিগুড়ি করিডর (চিকেন নেক) চিনা গোয়েন্দাদের বিশেষ নজরে রয়েছে৷ তাই কূটনীতির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে তারা ভুটানে দূতাবাস খুলতে মরিয়া৷ তবে দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের বন্ধুত্বের কারণে সেটা ঠেকিয়ে রেখেছে থিম্পু৷ আবার ভারত-চিন-ভুটানের মধ্যবর্তী ডোকলাম ইস্যুটি নিয়েও নতুন কূটনৈতিক তরজায় কি থিম্পুর ভূমিকা লক্ষণীয় হতে চলেছে৷

নির্বাচনের আগে থেকেই চিনের তরফে বারবার বার্তা দেওয়া হয়েছিল ভুটানকে৷ থিম্পু সফর করে যান চিনা উপ বিদেশমন্ত্রী কং জুয়ানইউ৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাঁর এই সফরটি ছিল হিমালয় ঘেরা দেশটিতে প্রভাব বিস্তার করার লোভনীয় পদক্ষেপ৷ চিনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’ পরে রিপোর্ট দেয়- রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি ভুটান। কিন্তু চিন আশা করছে, নেপালের মতো ভুটানও এসব ক্ষেত্রে স্বাধীন হতে পারবে। ইঙ্গিতপূর্ণ এমন মন্তব্যের পরেই ভুটানের সাধারণ নির্বাচনে চিনা কূটনীতির বিষয়টি বড়সড় আকার নিতে শুরু করে৷

পূর্ণাঙ্গ ফলাফলের পরে থিম্পু ঘিরে পাক খাচ্ছে বজ্র ড্রাগনের দেশে চিনা ড্রাগনের কূটনীতির মারপ্যাঁচ৷