বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে মুমূর্ষু কোনও রোগীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য আদর্শ হল ক্যাসুয়ালটি ব্লক৷ এমনই বলছেন পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ডাক্তাররাই৷ এবং, যে কারণে, মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এমসিআই)-র গাইডলাইনেও রয়েছে, কোনও মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের সঙ্গে থাকতে হবে ক্যাসুয়ালটি ব্লক৷

অথচ, কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমইআর) সহ পশ্চিমবঙ্গের কোনও সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ক্যাসুয়ালটি ব্লক নেই বলেই জানিয়েছেন খোদ এ রাজ্যেরই সরকারি ডাক্তাররা৷ আর, তার জেরেই যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুমূর্ষু রোগীর প্রাণরক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না ইমার্জেন্সিতে৷ তেমনই আবার, বিভিন্ন সময় কলকাতা সহ এ রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে কোনও না কোনও রোগীর ক্ষুব্ধ পরিজনদের জন্য৷ এবং, তার জেরে আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে যেমন ক্ষুব্ধ পরিজনদের কাছে নিগৃহীত হচ্ছেন কর্তব্যরত কোনও না কোনও ডাক্তার কিংবা নার্স অথবা স্বাস্থ্যকর্মী৷ তেমনই, ক্ষুব্ধ পরিজনদের হাতে হাসপাতাল ভাঙচুরের মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে৷ কারণ, এসএসকেএম হাসপাতাল এবং কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে এমন কোনও পরিকাঠামো নেই, যার মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে মুমূর্ষু কোনও রোগীর প্রাণরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা যায়৷

এ রাজ্যেরই সরকারি ডাক্তারদের তরফে জানানো হয়েছে, কলকাতার আইপিজিএমইআর-এ না থাকলেও ক্যাসুয়ালটি ব্লক রয়েছে আইপিজিএমইআর চণ্ডীগড়, দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস) এবং দক্ষিণ ভারতের কোনও কোনও হাসপাতালে৷ যদিও, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালুর জন্য বামফ্রন্ট পরিচালিত সরকারের আমলে প্রচেষ্টা হয়েছিল৷ তবে, এ রাজ্যের সরকারি কোনও মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে কোনও মুমূর্ষু রোগীকেও নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে দ্রুততার সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এমনকী অস্ত্রোপচার শুরু হয়ে যাবে, সে সব এখনও স্বপ্নের মতোই রয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন সরকারি চিকিৎসকরাই৷ অথচ, ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালু থাকলে শুধুমাত্র মুমূর্ষু কোনও রোগীর প্রাণরক্ষার প্রচেষ্টাই নয়, সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে অন্য রোগীদের চিকিৎসাও দ্রুততার সঙ্গে শুরু করা সম্ভব৷ আর, তার জেরে আবার, ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসা হচ্ছে না, এই ধরনের অভিযোগ যেমন এড়ানো যাবে৷ তেমনই এড়ানো যাবে ডাক্তার নিগ্রহ অথবা হাসপাতাল ভাঙচুরের মতো ঘটনাও৷

যে কারণে, শুধুমাত্র এসএসকেএম হাসপাতাল নয়৷ কলকাতা সহ এ রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জেলাসদর হাসপাতালগুলির ইমার্জেন্সি বিভাগের সঙ্গে ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালুর দাবি করছে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ওই চিকিৎসকদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম৷ এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার সজল বিশ্বাসের কথায়, ‘‘কোনও হাসপাতালে কর্ত্যবরত কোনও ডাক্তার নিগৃহীত হলে সেখানকার কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়৷ এই ধরনের পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের পক্ষে সেখানে পরিষেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বিভিন্ন হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণের জন্য ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে না৷ এই সব খামতির মধ্যে রয়েছে লোকবল অর্থাৎ, ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিষয়টিও৷ অথচ, রোগীর চাপও ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে৷ এ সবের ফলে চিকিৎসা পরিষেবা বিলম্বিত হতে বাধ্য৷ যে কারণে, আমরা দাবি করছি, অবিলম্বে এসএসকেএম হাসপাতাল সহ রাজ্যের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জেলাসদর হাসপাতালে অত্যাধুনিক মানের ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালু করতে হবে৷ যেখানে ২৪ ঘন্টার জন্য কোনও রোগীকে ভর্তি করানোর সুবিধা এবং অত্যাধুনিক মানের চিকিৎসা-যন্ত্র সহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এমনকী অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা থাকবে৷’’

ক্যাজুয়ালটি ব্লক চালুর পাশাপাশি সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় বিভিন্ন ধরনের পরিকাঠামোগত খামতি পূরণের জন্যেও ফের দাবি করছে সরকারি ডাক্তারদের এই সংগঠন৷ যদিও, আগেও বিভিন্ন সময় ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালুর জন্য এই সংগঠনের তরফে দাবি জানানো হয়েছে৷ তা হলে, কী বলছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী? এসএসকেএম হাসপাতাল সহ রাজ্যের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জেলাসদর হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে কোনও মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা যাতে দ্রুততার সঙ্গে শুরু করা যায়, তার জন্য সরকারি ওই ডাক্তারদের দাবি অনুযায়ী ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালু হবে? রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বলছেন, ‘‘এই পরিষেবা চালু রয়েছে৷ তার জন্যই তো চালু হয়েছে ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ড৷ আরও ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ড চালুর জন্য চেষ্টা চলছে৷’’ কিন্তু, ক্যাসুয়ালটি ব্লক চালুর জন্য দাবি উঠছে…? বিশ্বরঞ্জন শতপথী বলেন, ‘‘ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ড আর ক্যাসুয়ালটি ব্লকের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’’ স্বাস্থ্য অধিকর্তা এই কথা বললেও, ডাক্তার সজল বিশ্বাস বলছেন, ‘‘ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ড আর ক্যাজুয়ালটি ব্লকের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে৷’’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের কাছাকাছি ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ড রয়েছে ঠিকই৷ কিন্তু, ইমার্জেন্সি বিভাগে কোনও মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া যায়, তার জন্য ক্যাসুয়ালটি ব্লকের প্রয়োজন৷ ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে রোগীকে কার্যত ফেলে রাখা হয়৷’’ এখানেও থামেননি ডাক্তার সজল বিশ্বাস৷ তিনি বলেন, ‘‘এসএসকেএম হাসপাতাল সহ পশ্চিমবঙ্গের কোনও সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে এমন কোনও পরিকাঠামো নেই, যার মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে মুমূর্ষু কোনও রোগীর প্রাণরক্ষার জন্য চিকিৎসা শুরু হতে পারে৷ ইমার্জেন্সি পরিষেবার জন্য আদর্শ হল ক্যাসুয়ালটি ব্লক৷’’ ক্যাসুয়ালটি ব্লকে কোন ধরনের পরিকাঠামো থাকে? সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘ধরা যাক, মুমূর্ষু কোনও রোগীকে নিয়ে যাওয়া হল কোনও মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে৷ সেখানে ক্যাসুয়ালটি ব্লক থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ওই রোগীর চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া যাবে৷ এ ক্ষেত্রে মুমূর্ষু ওই রোগীর প্রাণরক্ষা করা-ই প্রাথমিক লক্ষ্য৷ সেই জন্য কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন এক্স-রে হোক অথবা সিটি স্ক্যান কিংবা রক্তপরীক্ষা, এমনকী ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা সহ প্রয়োজনে যাতে অস্ত্রোপচারও শুরু করে দেওয়া যায়, তার জন্য রাখতে হবে অপারেশন থিয়েটার৷ এই সব ব্যবস্থা একই ছাদের নীচে থাকা উচিত৷’’

না হলে? তিনি বলেন, ‘‘দেখা গেল, কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মুমূর্ষু কোনও রোগীকে নিয়ে যেতে হল ইমার্জেন্সি বিভাগ থেকে দূরের কোনও বিল্ডিংয়ে৷ আর, তার জন্য অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেল৷ তা হলে, কীভাবে ওই রোগীর প্রাণরক্ষার জন্য সময় পাওয়া যাবে?’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ক্যাসুয়ালটি ব্লকের পরিষেবা ২৪ ঘন্টার জন্যই চালু রাখতে হবে৷ এই ব্যবস্থায় শুধুমাত্র জুনিয়র নয়, সিনিয়র ডাক্তারদেরও রাখতে হবে৷ ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে এই ধরনের পরিকাঠামো নেই৷ সেই জন্যই ক্যাসুয়ালটি ব্লকের সঙ্গে ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডের পার্থক্য রয়েছে৷’’ সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘এসএসকেএম হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে কোনও মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে যাওয়ার পরে যদি তাঁর জন্য এক্স-রে অথবা সিটি স্ক্যানের প্রয়োজন পড়ে, তার জন্য ওই রোগীকে ইমার্জেন্সি থেকে দূরে নিয়ে যেতে হয়৷ সিটি স্ক্যানের ক্ষেত্রে আবার পিপিপি মডেলে চালু পরিষেবার জন্য টাকা জমা দেওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ও রয়েছে৷ তা হলে, মুমূর্ষু কোনও রোগীর প্রাণরক্ষার জন্য কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন ডাক্তাররা?’’

_______________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) সরকারি নির্দেশেই অকেজো মাল্টি-সুপার হাসপাতাল
(০২) মন্ত্রী-নেতার ‘বেড বুক’ বন্ধ করে বদলি হলেন সুপার
(০৩) হাসপাতালে বেড না মিললে পৌঁছে যেতে হবে কালীঘাটে!
(০৪) শাসকের দেউলিয়া রাজনীতিতে ডাক্তার-হাসপাতাল!
(০৫) সন্তানের পরিচয় জানাতে প্রথমেই আসুক মায়ের নাম!
(০৬) দলবদলের সঙ্গেই বাতিল করতে হবে জনপ্রতিনিধি-পদ
(০৭) ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না যৌনপল্লির ১৬% বাসিন্দা
(০৮) ৪.৫ কোটি ভুক্তভোগীতেও চাপা পড়ে যাবে সারদাকাণ্ড!
(০৯) ‘বৈপ্লবিক উন্নয়নে’ও ভরসা নেই সরকারি হাসপাতালে!
(১০) ভারতের প্রথম ডানা-য় ফ্র্যানচাইজি খুঁজছে বাংলা-দুর্বার
(১১) কলকাতায় এ বার উবের ক্যাব চালাবেন যৌনকর্মীরা
(১২) ‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’
(১৩) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’
(১৪) সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

_______________________________________________________________