পণ্ডিচেরি:  নরেন্দ্র মোদী সরকার পুরনো ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে গোটা দেশে নগদহীন অর্থনীতি চালু করতে গিয়ে এখন বিতর্কের মুখে ৷ অথচ অনেকেরই হয়তো জানা নেই এদেশেই রয়েছে এমন ছোট্ট এক শহর যেখানে কার্যত নগদ টাকার লেনদেন নেই৷ আজ বলে নয় পরীক্ষামূলক ভাবে ওই শহরের গোড়া পত্তন হয়েছে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে৷অবাক হচ্ছেন তো,  আরও অবাক হবেন যদি শোনেন এক বঙ্গসন্তানের নাম জড়িয়ে রয়েছে ওই ছোট্ট শহরের ভিতে ৷

অরোভিল
তামিলনাড়ুতে চেন্নাই থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট্ট নগর অরোভিল৷আবার পণ্ডিচেরি থেকে প্রায় ১২কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই নগরী৷চেন্নাই পণ্ডিচেরি সংযোগকারী ইস্ট কোস্ট রোড ধরে এগিয়ে গেলে পৌছে যাওয়া যাবে এই নগরীতে ৷ ফরাসীতে ‘অরোভিল’ কথাটির অর্থ হল  ‘সিটি অফ ডন’ বা প্রভাত নগরী৷ কারণ ফরাসীতে  “aurore”  মানে প্রভাত এবং  “ville” শব্দের অর্থ নগরী৷ আবার বলা হয়ে থাকে এই ‘অরোভিল’ শব্দটির ‘অরো’ অংশটি  আসলে এসেছে শ্রীঅরবিন্দের  নাম থেকেই৷

আলিপুর জেলে বন্দী থাকাকালীন শ্রীঅরবিন্দ ঘোষের (যিনি পরবর্তীকালে ঋষি অরবিন্দ বলে পরিচিত হন) মানসিক পরিবর্তন ঘটে, ওইসময় তিনি এক পরিজ্ঞান লাভ করেন ৷ তিনি চান সেই জ্ঞান পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ৷জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর চলে আসেন পণ্ডিচেরিতে উদ্যোগী হন আশ্রম গড়ে তুলতে ৷সেইমতো পণ্ডিচেরিতে ১৯২৬ সালের ২৪ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা হয় ‘শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম’৷ তবে তা প্রতিষ্ঠার মাত্র এক মাসের মধ্যেই শিষ্যা তথা ‘সহকর্মী’ মীরা আলফাসা (Mirra Alfasa), হাতে আশ্রমের যাবতীয় ভার দিয়ে নিজে অন্তরালে চলে যান। এই মীরাই পরবর্তী কালে বিখ্যাত হন ‘মাদার’  বলে৷মাদারের মনে হতে থাকে শ্রীঅরবিন্দের নির্দেশিত পথে যোগ সাধনা ঠিক মতো করতে গেলে সঠিক পরিবেশের প্রয়োজন। তারও বেশ কিছু বছর পর ইউনেস্কোর সহযোগিতায় শ্রী অরবিন্দ সোসাইটির ‘মা’ মীরা আলফানসা  অরোভিল শহর প্রতিষ্ঠা করেন। রজার অ্যাঙ্গার নামের এক ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট এই শহরের পরিকল্পনা ও নকশা করেছিলেন। একেবারে ব্রহ্মাণ্ডের গঠনকে মাথায় রেখে এই শহরকে গড়ে তোলেন অ্যাঙ্গার৷শহরের একেবারে মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছিল একটি মাতৃমন্দির। বর্তমানে এই মাতৃমন্দিরে শহরের মানুষজন সমবেত হন ধ্যান করার জন্য।

১৯৬৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অরোভিলের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে ১২৪টি দেশের প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। প্রাথমিক ভাবে এই নগর গড়া হয়েছিল পঞ্চাশ হাজার লোকের বসবাসের কথা মাথা রেখে৷ শহর গঠনের পর প্রথম ২০ বছরে এখানে ২০টি দেশের প্রায় চারশো লোকের বাস ছিল৷পরবর্তী ২০ বছরে দেখা যায় ৪০টি দেশের  প্রায় দুহাজার লোকের বাস এখানে৷ বর্তমানে ৪৯ টি দেশের প্রায় আড়াই হাজার লোকের বাস তারমধ্যে ভারতীয় ফরাসী এবং জার্মান মিলেই রয়েছেন দুই তৃতীয়াংশ৷ এখানে স্কুল, হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আধুনিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পরিষেবা মজুত রয়েছে। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নিয়মনীতি মেনে পরিচালিত হয় এই শহর।  ১৯৬৮ সালে ‘অরোভিল’ এই স্থানের জন্মের দিনে ১২৪টি রাষ্ট্র ও ভারতের তদানিন্তন ২৩টি রাজ্য থেকে যুবক-যুবতিরা এক মুঠো করে তাদের নিজেদের দেশের মাটি মানব একতার প্রতীকরূপি একটি কমলাকৃতি কলশে ভরে দেন। এই কলশ কেন্দ্র করে মহাবিশ্বের প্রতীকরূপি এক বিশেষ প্রকারের স্বর্ণ-গোলক তৈরি করা হয়েছে, যা মাতৃমন্দির নামে পরিচিত৷ মাতৃমন্দিরের এবং শহরের স্থপতি ‘রজার অজের’, গোলকের উপর ১৪০০টি সোনার প্রলেপ দেওয়া বড় বড় চাকতি দিয়ে মুড়ে দিয়েছেন যা দূর থেকে অতি সুন্দর দেখতে লাগে। এই উপাসনাগৃহ মাতৃমন্দির অবস্থান করছে একেবারে এই নগরের মধ্যিখানে৷তবে সেখানে উপাসন করার জন্য আগে ্নুমতি নিতে হবে৷

অরভিলের অর্থনীতি
নগদহীন কেমন করে চলে অরোভিলের বাসিন্দাদের জীবন? এখানে  ‘সেবার বদলে সেবা’ নীতি অনুসরণ করে, যা আদপে প্রাচীন বিনিময় প্রথারই একটি আধুনিক সংস্করণ। বসবাসকারী নাগরিকরা প্রতি মাসে এই সেবা অর্থ অথবা শ্রম উভয়ের মাধ্যমেই জমা করে  কেন্দ্রীয় তহবিলে৷১৯৮৫-৮৬ সালে অরোভিলে একটি ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস সেন্টার(এফএফএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানকার বাসিন্দারা নিজেদের অর্থ অনলাইন এবং অফলাইন পদ্ধতিতে এই আর্থিক পরিষেবা কেন্দ্রে জমা করতে পারেন। পরিবর্তে গ্রাহককে একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়া হয়। অরোভিলের অন্তর্গত প্রায় ২০০টি বাণিজ্যেক কেন্দ্র এবং ছোট-বড়ো অন্যান্য দোকানে এই অ্যাকাউন্ট নম্বরের মাধ্যমেই তারা বিকিকিনি করতে পারেন।ফলে কোনও নগদ লেনদেনের প্রয়োজনই হয় না। এখানকার বাসিন্দাদের দেওয়া অ্যাকাউন্ট নম্বরের সঙ্গে সংযোগ থাকে তাদের কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্টের ৷আবার ঘুরতে আসা মানুষজনকেও অনুরোধ করা হয় অস্থায়ী অ্যাকাউন্ট খুলতে এবং দেওয়া হয় ডেবিট কার্ডের মতোই ‘অরো কার্ড’৷একই রকম ভাবে অতিথিরা অর্থ অথবা শ্রম দিতে পারেন যা তাদের পক্ষ থেকে অরোভিলের উন্নয়েন অবদান৷ বাজেটের অংশ বিশেষ হয়েওঠে৷এখানে থাকা, খাওয়ার জন্য সে ভাবে কোনও পয়সা লাগে না। বরং নিজের সাধ্যমতো ‘সেবা’ দিয়ে প্রত্যেকে শহরের উন্নয়নে নিজস্ব অবদান রাখেন।

ভারত সরকার অরোভিল ফাউন্ডেশন ম্যানেজ করার দায়িত্বে থাকলেও এখানকার গোটা বাজেটের সামান্য পরিমাণই সাহায্য করতে হয়৷বাজেটের অর্থ মূলত আসে অরোভিলের বাণিজ্যিক ইউনিটগুলি থেকে কারণ সেগুলির মুনাফার ৩৩ শতাংশ অরোভিলের কেন্দ্রীয় তহবিলে অনুদান হিসেবে জমা করে৷এখানে অথিতিশালা, নির্মাণ কার্যের পাশাপাশি রয়েছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প যেখানে হ্যান্ডমেড পেপারের নানা পণ্য,  তেল, সাবান, ধূপকাঠি ইত্যাদি তৈরি হয়৷এইসব উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য পণ্ডিচেরি সহ দেশে বিদেশে অরোভিলের নিজস্ব বিপণিতে বিক্রি করা হয়৷এই সব পণ্য উৎপাদনের জন্য আশে পাশের অঞ্চলে বসবাসকারী পাঁচ হাজার লোক কাজ করে৷আবার নিজেদের শ্রমের বিনিময়ে অরোভিল ফাউন্ডেশনের তরফে সামান্য কিছু বেতনও পান নাগরিকরা। কিন্তু সেই উপার্জিত অর্থ অরোভিলের চৌহদ্দির মধ্যে খরচ করার প্রয়োজন পড়ে না তাদের। ভারত সরকারও এই শহরকে এবং এর অভিনব অর্থব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.