সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ১৯১১ সাল বললেই বাঙালির মনে পড়ে যায় মোহনাবাগানের ব্রিটিশদের হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জেতার কথা৷ বাঙালিদের কাছে তো বটেই গোটা দেশের কাছে সেদিনের মোহনবাগানের জয়টা স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে গিয়েছে৷ সেই জয়ের মাধ্যমে যেন পরাধীনতার গ্লানি থেকে আলাদা মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল কলকাতার মানুষ৷

এদিকে ওই বছরটায় বাঙালির জীবনে আরও দু’টি ঘটনা ঘটে গিয়েছিল৷ একটা হল স্বদেশি আন্দোলনের জেরে ব্রিটিশ সরকার পিছু হটে বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিল৷ অন্যদিকে পাশাপাশি ঘোষণা করা হয়, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হবে৷

গত শতাব্দীর শুরুতে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব ছিল বাঙালির নিয়ন্ত্রণে৷ আর তখন বাঙালিই বলতে গেলে গোটা দেশকে পথ দেখাচ্ছে ৷ ভারতের রাজধানী কলকাতায় বাঙালির প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী মনোভাব দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন লর্ড কার্জন৷ রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন বাঙালিকে দুর্বল করতে ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগকেই একমাত্র উপায় বলে মনে হয়েছিল বড়লাটের ৷

বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ চেয়েছিল, একটি মুসলমান প্রধান রাজ্য গঠন করতে ৷ এর আসল উদ্দেশ্য ছিল বাংলায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্য বিভেদ সৃষ্টি করা ৷ কার্জনের পরিকল্পনা বানচাল করতে নড়ে চড়ে উঠল বাঙালি৷

সেদিন অবশ্য ইংরেজদের বিরোধিতা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার তাগিদটা অনুভব করেছিল বিদ্রোহী বাংলা। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে ইংরেজদের আঘাত করতে বিদেশি পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। আর বিদেশী পণ্য বর্জনের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে স্বদেশি পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে ছিল বাংলার মানুষ।

ওই সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবীরা যখন লড়ছে তখনই আবার ফুটবল মাঠে গোরাদের বিরুদ্ধে লড়ে গেল মোহনবাগান৷ ১৯১১সালে ২৯জুলাই ব্রিটিশদের দল ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে হারিয়ে মোহনবাগান ক্লাব আই এফ এ শিল্ড জিতল৷ বুট পরা গোরাদের সঙ্গে সেদিন খালি পায়ে খেলে ২-১ গোলে জিতেছিল মোহনবাগান ৷ যা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের যুগে অন্যমাত্রা পেয়েছিল৷

এদিকে পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে তাতে ইংরেজ অনুভব করেছিল কলকাতা থেকে বসে দেশের শাসনভার পরিচালনা করা সহজ হবে না। ফলে রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছিল। খেলার মাঠে পরাজয়ের ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই অবশ্য ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানাস্থরিত করার কথা ঘোষণা করেছিলেন সম্রাট পঞ্চম জর্জ। আর সেদিনই অবশ্য এর পাশাপাশি ঘোষণা করা হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ রদের কথা।

দ্বিতীয় ঘোষণাটির জন্য বাঙালির বিজয়োল্লাসের শেষ ছিল না৷ অনেকেই সেদিন গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন-Settle Fact -কে Unsettle Fact করা গিয়েছে৷ কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদের অন্তরালে এই রাজধানী স্থানান্তরের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দিক থেকে চরম আঘাত আনা হয়েছিল কলকাতার উপর।

সেদিনের capital shift এর অর্থ শুধুমাত্র রাজধানী স্থানান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা যে আদতে কলকাতা থেকে মূলধনের স্থানান্তরও ঘটিয়েছিল ৷ বাংলার মানুষের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ইংরেজরা রাজধানী স্থানান্তরিত করে একপ্রকার বদলা নিয়েছিল।

বক্তৃতা- গান- বোমার মাধ্যমে যারা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে চেয়েছিলেন তাদের যেন উচিত শিক্ষা দিয়ে গেলেন ব্রিটিশ সম্রাট ৷ তাঁর কূটনৈতিক চাল তখন বুঝতে পারেনি আপামর বাঙালি৷ তখন থেকেই আসলে শুরু হল কলকাতার পতন৷

আর তার আগে দুই শতাব্দী ধরে নানা আক্রমণে জর্জরিত দিল্লি যেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ পেল৷ কলকাতার এসপ্লানেড- ডালহাউসি অঞ্চল থেকে সরকারি দফতর সরল দিল্লিতে৷ আবার ক্লাইভ স্ট্রিট অথবা চৌরঙ্গিতে থাকা ম্যানেজিং এজেন্সিগুলি কেমন যেন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে লাগল প্রতিদ্বন্দ্বী বম্বের সঙ্গে৷

বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও তার আগে অনেক রক্ত ক্ষয়,জেল দ্বীপান্তর ঘটেছিল ৷ অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমা পরিসীমা থাকল না৷ রাজনৈতিক প্রতিবাদের ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গ আবার একত্রিত হল ঠিকই কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক এক নতুন বিভক্তির মাধ্যমে বিহার, ওডিশা, অসমের অঞ্চলগুলো বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হয়।

পাট ও অন্যান্য কৃষি পণ্যে সম্বৃদ্ধ সুর্মা ভ্যালি বেরিয়ে গেল৷ বাদ পড়ল খনিজ সম্পদে সম্বৃদ্ধ মানভূম সিংভূম জেলা৷ একদিকে পাটের মতো কৃষি পণ্য অন্যদিকে লোহা কয়লা ম্যাঙ্গানিজ অভ্র সহ কত রকমের খনিজ পণ্য সম্বৃদ্ধ অঞ্চলকে বাংলা হারাল৷ বাংলার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে বাঙালির উপর ভালই প্রতিশোধ নিল ব্রিটিশ৷ পাশাপাশি রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি এমনই অস্থির করে তোলা হল যার জেরে সাড়ে তিন-চার দশক পরে সেই বঙ্গভঙ্গকেই মেনে নিল বাঙালি৷

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনা পরিস্থিতির জন্য থিয়েটার জগতের অবস্থা কঠিন। আগামীর জন্য পরিকল্পনাটাই বা কী? জানাবেন মাসুম রেজা ও তূর্ণা দাশ।