সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: গত কয়েকদিনের তিনটি ঘটনা৷ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য কেন্দ্রের ২.১ লক্ষ কোটি টাকা মূলধন যোগানের ঘোষণা৷ তেজী শেয়ার বাজারে সূচকের উত্থান , বিশেষত ব্যাংকের শেয়ারের দাম লাফ দিয়ে বেড়ে চলা ৷ এর পাশাপাশি ঋণের বোঝায় ঝুলে পড়া অনিল আম্বানি গোষ্ঠীর রিলায়েন্স কমিউনিকেশনের ব্যবসা গোটানো ও কর্মীদের ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া৷ এই তিনটি ঘটনার গভীরে গেলে দেখা যাবে একটার সঙ্গে একটার যোগ সূত্র রয়ে গিয়েছে৷

আরও কয়েকটা দিন পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে ‘কর্পোরেট লবি’র চাপ অগ্রাহ্য করেও চলতি মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে রিজার্ভ ব্যাংকের ছয় সদস্যের মনিটারি পলিসি কমিটি৷ যেটা অবশ্যই হতাশ করেছে শিল্পপতি থেকে তাঁদের তাবেদার রাজনৈতিক নেতাদের৷ পরিস্থিতি বিচার করে ব্যাংক তথা দেশের স্বার্থের জন্য মূলধন জোগানের কথা বলা হলেও আসলে তো এটা কর্পোরেটদের জন্য তোফা ছাড়া কিছুই নয়৷

ক্রমাগত সুদ কমিয়ে একদিকে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে অন্যদিকে অনাদায়ী ঋণের চাপে ক্রমশ স্বাস্থ্য খারাপ হওয়া ব্যাংকে টাকা রাখা আদৌ কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্নও উঠছে৷ উল্টো দিকে চলছে শিল্পপতিদের নানা অছিলায় ঋণ দেওয়া যা বহু ক্ষেত্রেই অর্থনীতিতে গতি আনতে ব্যর্থ৷

৯০০০ কোটি টাকা ঋণের দায় না মিটিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শিল্পপতি বিজয় মালিয়া৷ দেশ ছাড়ার পর তাঁকে ধরতে নাকি উঠে পড়ে লেগেছে এখন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি৷ অথচ লন্ডনে গ্রেফতার হওয়ার মিনিট কুড়ির মধ্যেই জামিন পেয়ে যান এই লিকার ব্যারন৷ তবে শুধু যিনি পালিয়েছেন তার কথা বাদই দিলাম যারা এখন বড় বড় ঋণ নিয়ে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিচ্ছে এই সরকার৷ নাকি যাতে সেই সব শিল্পপতিরা ফের তাদের প্রয়োজন মতো ব্যাংক ঋণ পেতে পারে সেটা দেখাই এই সরকারের উদ্দেশ্য ?

এমনিতেই সব সময়ই ‘কর্পোরেট লবি’র চাপে বার বার সুদের হার কমানো পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে বর্তমান অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে৷ কিন্তু এই দেশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ ব্যাংকে জমা রাখা টাকা থেকে সুদ পেয়ে সংসার চালায় তাদের কথা মনে রাখতে চাননি৷ শুধু তাই নয় নিম্ন অথবা মধ্যবিত্ত মানুষ ঋণ নিলে কোনও কারণে পরিশোধে সমস্যা হলে ব্যাংক তা আদায় করতে যতটা তৎপর হয় তার থেকে বহুগুণ টাকা ঋণ নেওয়া এক একজন শিল্পপতিদের কাছ থেকে তা আদায় করার ব্যাপারে সেই তৎপরটা থাকে না৷ বরং ঋণ না মেটাতে পারা শিল্পপতিকে উল্টে আরও কিছু ঋণ দিতেও দ্বিধা করা হয় না৷ এজন্য অজুহাত দেখান হয় যদি আরও কিছুটা ঋণ দিয়ে ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসাটা বাঁচান যায় তাহলে দেশ তথা সামগ্রিক অর্থনীতির পক্ষে মঙ্গল৷

ক্ষতিগ্রস্ত কিংফিশারের পতন আরম্ভ হয়ে যাওয়ার পরেও তো ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল৷ অথচ ঋণ কি আদৌ সংস্থা বাঁচাতে কাজে লেগেছিল নাকি বিজয় মালিয়ার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য ব্যয় হয়েছে সেই প্রশ্ন বাড়ে বাড়েই উঠেছে৷

কৃষকরা ঋণের টাকা না মেটাতে পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা গেলেও সেভাবে কোনও শিল্পপতিকে ঋণের টাকা মেটাতে না পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা যায় না৷ এটা ঠিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানে ভোট ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে অনেক সময় কৃষি ঋণ মকুব করা হয়৷ যে কোনও ঋণ মকুবই ব্যাংকের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর৷ কিন্তু কৃষকদের ঋণ মকুবের কথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই যে দল যখন করেন ফলাও করে প্রচার করেন ৷ অথচ তার চেয়ে অনেক অনেক বড় অংকের টাকা শিল্পপতিদের জন্য মকুব করা হলে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই চেপে যেতে দেখা যায়৷ জানতে পারা যায় বলেই কৃষি ঋণ মকুবের পরে অনেক নাগরিকই চায়ের আড্ডা থেকে ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় সোচ্চার হন এর বিরুদ্ধে৷ তাদের দেওয়া করের টাকায় এই ঋণ মকুব হল বলে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়৷ কিন্তু প্রচারের অভাবে শিল্প ঋণ অনুৎপাদক সম্পদে পরিণত হলেও তা তেমন জানতে পারা যায় না৷ ফলে তেমন আলোচনাতেও আসে না৷ অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বলা চলে বিজয় মালিয়ার ঘটনা৷ তাকে নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিতে দেখা গিয়েছে অনেককেই ৷

চলতি মাসেই সুদের হার নির্ধারণ করতে গিয়ে কমিটি সব সদস্য এক মত হতে পারেননি৷ তবে রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল, ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্য এবং পমি দাস মনে করেন, অর্থনীতির সংক্রান্ত যেসব রিপোর্ট এসেছে তা থেকে সুদ কমানো সম্ভব নয়। সরকারের সঙ্গে বিশেষত অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নরের নীতি নির্ধারণ নিয়ে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়৷ এনডিএ আমলের মতো ইউপিএ আমলেও তেমন সংঘাত দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু সুদের হার নির্ধারণের জন্য একছত্র ক্ষমতা রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নরের কাছ থেকে কেড়ে নিতেই বর্তমান সরকার রিজার্ভ ব্যাংকের ছয় সদস্যের মনিটারি পলিসি কমিটি গঠন করেছে৷ কিন্তু তাতেও সুবিধা হচ্ছে না এই সরকারের৷

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের কালো টাকা উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমনের নামে নোট বাতিল করলেও সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি৷ কারণ সন্ত্রাসবাদীদের অশান্তি যেমন থামেনি তেমনই আবার ৯৯ শতাংশ টাকাই ব্যাংকে ফিরে এসেছে৷ ২০১৪ সালে যেখানে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ছিল ২.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা সেটাই এই আমলে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকা৷ গত বছরে রিজার্ভ ব্যাংক সূত্রে জানা গিয়েছিল অনাদায়ী ঋণের ২৫ শতাংশ ছিল ১২টি কর্পোরেট সংস্থার হাতে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কথা সুপারিশ করা হলেও তা সেভাবে কার্যকর হয়নি৷ এদিকে মোদী জমানায় প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে৷ ফলে প্রশ্ন উঠেছে ওই অনাদায়ী কর্পোরেট ঋণের টাকা আদায় করতে কেন তৎপরতা দেখান হল না৷ অর্থাৎ সরকারি মদতে এই পথে ব্যাংকে জমে থাকা সাধারণ জনগণের সঞ্চিত অর্থ লুট হয়ে যাচ্ছে ৷ তার উপর এই সরকার আরও ২.১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংকে আনার ব্যবস্থা করছে ৷ সেই টাকা তো খাটবে শেয়ার বাজারে কিংবা চলে যাবে কর্পোরেট কর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের পকেট ভরাতে৷

অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দাবি করবেন, ভারতীয় অর্থনীতি শক্ত জমির ওপর দাঁড়িয়ে এবং তার মৌলিক বুনিয়াদের ভিতও খুব দৃঢ়। কিন্তু কঠিন বাস্তবটা হল-৪৭,০০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা ঘাড়ে অনিল অম্বানি গোষ্ঠীর রিলায়েন্স কমিউনিকেশনের এখন বেহাল দশা৷ ডিরেক্ট -টু-হোম পরিষেবা ও রিলায়েন্স ডিজিটাল টিভি বন্ধ করেও চলছে না ফলে লোকসানের বহর কমাতে মাস খানেকের মধ্যে টু-জি থ্রি-জি মোবাইল ভয়েজ পরিষেবা বন্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে এই টেলিকম সংস্থাটি ৷ সংস্থার এই ভাবে ব্যবসা গোটানোয় বহু কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত৷ আপাতত এই সংস্থার ৩০০০ কর্মী হলেও ১০০০-১২০০ কর্মী কাজ হারাতে চলেছেন বলে আশংকা করা হয়েছে৷

শেয়ার বাজার লাফিয়ে লাফিয়ে উঠলেও লোকের চাকরির বাজার খারাপ হচ্ছে৷ আর এই ভাবে ব্যবসা গোটানো হলে, সংস্থা উঠে গেলে ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণ পরিশোধ তো হবে না৷ তবে লোক চাকরি হারালেও আর ব্যাংক রুগ্ন হলেও কর্পোরেট কর্তৃপক্ষ দায়ী হবেন না কারণ তাদের দায় তো সীমাবদ্ধ ৷

- Advertisement -