মাহবুব রোকন, ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩০ ডিসেম্বর৷ নানা অনিশ্চয়তার পর অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় দেশজুড়ে প্রায়ই উৎসবের আমেজ শুরু হয়েছে। নিজ নিজ দল থেকে সংসদ সদস্য পদে ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মানসে তৃণমূল স্তরের মফস্বল জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে বড় সব বিভাগীয় শহরের নেতারাও কেন্দ্রের দিকে দৌড়চ্ছেন।

পড়ুন: গোপালগঞ্জে হাসিনা নিশ্চিত কিন্তু খালেদা?

গত কয়েক দিনে কেন্দ্রে গিয়ে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও অন্যসব দল থেকেও যথেচ্ছা মনোনয়নপত্র কিনেছেন নেতারা। এতেই শেষ নয়, বর্তমানে চলছে দল থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন মনোনয়নের সর্বশেষ হিসেব নিকেশ। শেষপর্যন্ত কেন্দ্র থেকে দলীয় প্রতীকের মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় কে ফিরছেন ? -এমন প্রশ্নে যেমন সাধারণ ভোটারগণ উন্মুখ চেয়ে আছে ঢাকার দিকে ঠিক তেমনই নিজে বা নিজের গ্রুপের প্রার্থীর পক্ষে দলের মনোনয়ন ভাগিয়ে নিতে ঢাকায় প্রাণপণ শেষ চেষ্টাটি চালিয়ে যাচ্ছে। অন্তত: গেলো কুড়ি দিন ধরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে এ অবস্থা বিরাজ করছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে খবর বেরুচ্ছে এ মনোনয়নের পেছনে অনেক প্রার্থী বড়ো অংকের টাকা খরচ করার চিন্তাভাবনা করছে।

পড়তে পারেন: পদ্মাপারে ভোট: নির্দল হিজাবে মুখ ঢেকে ভোটে নামছে ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ জামাত

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যাচ্ছে -এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বড় ও মধ্যম সারির নেতারা ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন। এই সময় দলীয় নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর ছিল শহরাঞ্চল থেকে শুরু প্রান্তের গ্রামীণ জনপদ। বিশেষ করে দেশজুড়ে ক্ষমতাসীন পার্টি আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রী ও নতুন পদ প্রার্থী নেতাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

এই সময়টিতে সংগঠনের উচ্চ পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায়ের জনপ্রিয়তা নিয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চলছিল। এই সকল বিষয় আন্দাজ করতে পেরে নির্বাচনী এলাকায় নিজের অবস্থান জানান দিতে মাঠে রাতদিন সক্রিয় ছিলেন। সম্প্রতি দেশটির নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোট গ্রহণের আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ ঘোষণা আসবার পর মুহূর্তেই ভোটের মাঠে পিনপতন নীরবতা পড়ে যায়। গ্রাম থেকে শুরু করে শহর অঞ্চলের বিভিন্ন ভোটারের সাথে আলাপকালে তারা এমন তথ্যই জানান।

বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক কর্মী-সমর্থকের সাথে আলাপ করে জানা গেছে -নেতারা দল থেকে নিজের চূড়ান্ত মনোনয়ন নিশ্চিত না করে ঢাকা থেকে নির্বাচনী এলাকায় ফিরতে নারাজ। তাছাড়া দলের ত্যাগী নেতাদের পাশ কাটিয়ে হুট করে দলে ভিড়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করে মনোনয়ন নিতে অনেকেই বেশ সক্রিয় রয়েছে। এমন পটভূমিতে দলীয় মনোনয়নের চূড়ান্ত টিকিটের শেষ না দেখে নির্বাচনী এলাকায় ফিরতে চাচ্ছেন না মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।

সূত্রের খবরে জানা গেছে -এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের তিনশোটি সংসদীয় আসনের মধ্যে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় প্রতিটি আসনেই একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। সবদিক বিবেচনায় যোগ্য প্রার্থীকে দলের টিকিট দেওয়া হবে উল্লেখ করে দলগুলোর কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে প্রার্থীদের নিজের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে কাজ করার জন্য নির্দেশনামুলক তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনও নেতাই আদতে দলের এই নির্দেশনা মানছে না বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোটের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় দফতরের ডাকে দলের খসড়া মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঢাকার পথে ছোটে নেতারা। এসময় কেন্দ্রে নিজের দল ভারি দেখাতে সাথে নিয়ে যাওয়া হয় অসংখ্য কর্মী-সমর্থককে। খবর নিয়ে জানা গেছে -দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি কালীন শহরের বড়ো পথগুলোতেই ব্যাপক জনসমাগম ও যানজটের সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন: পদ্মাপারে ভোট: বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ

পল্টন এলাকার একটি আবাসিক হোটেলের যুগ্ম ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান -যে সকল অতিথিগণ গত আট-দশ দিন আগে তারা এখনও হোটেল কক্ষ ছাড়ছেন না। দল থেকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন নতুন লোক ঢাকায় এসে হোটেল কক্ষের সন্ধান করছেন বলে জানান ঢাকার এই হোটেল কর্মী।

উত্তর-পশ্চিম অংশের জেলা চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় সাংবাদিক সালাহউদ্দিন কাজল কলকাতা ২৪/৭কে জানাচ্ছেন -সব দলের বড় ও মধ্যম সারির নেতারা বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। এমন পটভূমিতে এই অঞ্চলের টোটাল রাজনীতির মাঠ অনেকটা ফাঁকা রয়েছে, নেই কোনও দলের সাংগঠনিক তৎপরতাও। বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় দফতর গুলো ঘুরে এসে তিনি জানান -তাদের সবক’টি দফতরেই তালা ঝুলানো রয়েছে।

অপরদিকে দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য জেলা বান্দারবানে রয়েছেন সাংবাদিক অসীম দাশগুপ্ত। কলকাতা ২৪/৭কে তিনি জানান- গেলো কয়েকদিন ধরে এখানকার তিনটি পার্বত্য জেলায় কোনও প্রকার রাজনৈতিক তৎপরতা নাই বললে চলে। দলের দফতরগুলো বন্ধ, নেতাকর্মীদের ভিড় নেই আগের মতো।

দক্ষিণের পর্যটন জেলা কক্সবাজার থেকে স্থানীয় সাংবাদিক শাহেদ মিজান জানান -দলগুলোর বড় নেতা থেকে শুরু করে তাদের বিশ্বাসভাজন কর্মীরা দীর্ঘদিন থেকে ঢাকায় অবস্থান করছেন। বড়ো দু’দলের অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী মনোনয়ন পাচ্ছে বা পাচ্ছে না বলে প্রতিনিয়ত গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময়ে ধরে এ অবস্থা বিরাজ করায় জেলা শহরজুড়ে রাজনীতির ফাঁকা মাঠে দলের সমর্থকদের মাঝে চরমও হতাশাও দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজার-২ আসনে বিএনপির একজন হেভিওয়েট প্রার্থী ও দেশটির প্রাক্তন(সাবেক) প্রভাবশালী মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বর্তমানের ভারতে আটকে৷ ঢাকা থেকে রহস্যজনভাবে নিরুদ্দেশ হওয়ার পর মেঘালয়ে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল৷ এরপর থেকে তিনি শিলংয়ের জেলে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি আদালতের রায়ে মুক্তি পেলেও নানা জটিলতায় বাংলাদেশে ফিরতে পারছেন না। এই আসনে অপর হেভিওয়েট প্রার্থী ও দু’বারের সাবেক (প্রাক্তন) এমপি আলমগীর ফরিদকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সম্প্রতি তাকে আবারও দলে ভেড়ানো হয়।

ধারণা করা হচ্ছে দলের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য তাকে শেষ মুহূর্তে এসে দলে টেনে নেওয়া হয়। নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনিও রয়েছেন ঢাকায়। কলকাতা২৪/৭-কে আলমগীর ফরিদ জানান -আসন রক্ষার স্বার্থে কেই দল থেকে মনোনয়ন দেবে এমনটি তিনি আশা করেন। এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত নির্বাচনী এলাকায় ফিরে ভোটের কাজে নেমে পড়বেন বলে জানান।