সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সন্ত্রাসদমন অভিযান সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে৷ মূলত আইএস দমন অভিযানে উভয় দেশ উভয়কে সহায়তা জোগানোর অঙ্গীকার করেছে৷ দুটি দেশ যখন এই ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন সব শর্তই খোলাখুলি সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয় না৷ এমন কিছু বোঝাপড়া থাকে, যা ওই দুই দেশের কর্তৃপক্ষই শুধু জানেন— আর কাউকেই সে কথা জানতে দেওয়া হয় না৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

প্রশ্ন হল, সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির যে চুক্তি হয়েছে তাতে কি মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত হয়েছে? অনেকেরই ধারণা, দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্কের আগের মতো শক্তি আর নেই৷ কিন্তু ভারতের বুকেই কোনও কোনও রাজ্যে সেই নেটওয়ার্কের জাল এখনও এত শক্তপোক্ত যে, বাইরের কোনও রাষ্ট্রের তেল তাদের না হলেও চলে৷

বরং, আজও পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার কিংবা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে এমন অনেক পলিটিক্যাল মাফিয়া ও অপারেটর রয়েছে দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্কের সহায়তা না পেলে যারা এক পা-ও নড়তে পারবে না৷ সেইসঙ্গে প্রতিবেশী একাধিক রাষ্ট্রে দাউদ ইব্রাহিমের লোকজন বহাল তবিয়তে তাদের কাজকর্ম চালাচ্ছে৷ আর সেই নেটওয়ার্কের ভরসাতেই কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীরাও তাদের টাকাকড়ি এবং অস্ত্রশস্ত্র অনায়াসেই এক জায়গা থেকে আর জায়গায় পাঠিয়ে দিতে পারে৷

দাউদের এই কাজ-কারবার সম্পর্কে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তারা কিছুই জানেন না, এ কথা তাঁরা যদি কোরান ছুঁয়েও বলেন তাহলেও কেউ বিশ্বাস করবে না৷ দাউদের গতিবিধি ও কাজকর্মের খবর যেমন পাক সামরিক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সও (আইএসআই) জানে ঠিক তেমনই সৌদি আরব সহ পারস্য উপসাগর সংলগ্ন বিভিন্ন শেহশাহির ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলিও সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল৷

কিন্তু বহির্বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক বোঝাপড়ার চাইতেও এই শেখশাহিগুলির এই মুহূর্তে বড় সমস্যা হল নিজেদের পারিবারিক কলহ৷ দাউদ ইব্রাহিমের মতো মাফিয়া ডনের পক্ষে সেসব কেচ্ছার খবর রাখা অপেক্ষাকৃত সহজ৷ আর সে কারণেই তারা হেসেখেলে এই আরব শেখশাহিগুলির বুকে তাদের কার্যকলাপ চালায়৷ এখন এই ডি কোম্পানির ব্ল্যাকমেলিংয়ের দুর্যোগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তৃপক্ষ যদি দাউদের মোকাবিলায় ভারতের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে চলেন, তাহলেই মঙ্গল৷ না হলে আগামী দিনে ভারতকে অন্ধকারে হাতড়েই বেড়াতে হবে৷

দাউদ কোম্পানির মধ্যে নাকি খুব গণ্ডগোল বেধেছে৷ ছোটা শাকিলের সঙ্গে দাউদের সম্পর্ক ইদানীং খুব খারাপ বলে খবর রটেছে৷ কিন্তু মাফিয়ারা নিজেদের স্বার্থেই একটা ব্যাপার খুব ভালো বোঝে৷ সেটা হল, যদি নিজেদের অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয়, তাহলে তারা এক হয়ে যেতে পারে৷ সুতরাং, ওদের মধ্যে গণ্ডগোল বেধেছে দেখে অন্তত ভারতীয় সেনাবাহিনীর উল্লসিত হওয়ার কোনও কারণ নেই৷

ওই মাফিয়াদের একটা না একটা ছিদ্রপথের শরণাপন্ন হয়ে সন্ত্রাসবাদীরা আবারও ঠিক ভারতের মাটিতে ছোবল মারার চেষ্টা করবে৷ ঠিক যেমন তারা মেরেছিল সংসদে কিংবা ২৬/১১-এ মুম্বইতে৷ তখন পলিটিশিয়ানরাও শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীরই পায়ে হত্যে দিয়ে পড়বেন৷ কারণ, ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে সন্ত্রাসবাদীদের বিষদাঁত ওপড়াতে সামরিক বাহিনীর বিকল্প আর নেই৷

এই অবস্থায় যদি সন্ত্রাসদমন অভিযানের প্রাথমিক শর্ত হিসাবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তারা দাউদের মতো মাফিয়া ডনদের হাতে বেড়ি পরাতে পারেন এবং ভারতে তাদের ফেরত পাঠান, তাহলেই কাজের কাজ হবে৷ নয়তো ছুটকো-ছাটকা সন্ত্রাসবাদীকে ধরে বাস্তবে তেমন কোনও ফল মিলবে না৷

আমেরিকার প্রশাসন ব্যাপারটা আরও অনেক আগে বুঝেছিল বলেই ২০০২ সালে তারা আমেরিকার মাটিতে দাউদ ইব্রাহিমের যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল৷ তারাও সেটা করত না, যদি না ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেদেশের মাটিতে আত্মঘাতী বিমান হামলার ঘটনা ঘটত৷ ভারত বহু আগেই আমেরিকাকে দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানিয়েছিল এবং তাদের সম্পর্কে ব্যবস্থাও নিতে বলেছিল৷ যেহেতু ৯/১১-র আগে আমেরিকাকে সরাসরি কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদের আঘাত পেতে হয়নি, তাই ২০০২ সালের আগে পর্যন্ত তারা ডি কোম্পানিকে আটকানোর ব্যাপারে কোনও তৎপরতা দেখায়নি৷

দাউদের নেটওয়ার্ক এখন পূর্ব গোলার্ধের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে৷ শুধু আরব শেখশাহি নয়, মধ্য এশিয়া, ভারত উপমহাদেশ ছাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও দাউদের লোকজন হরেক রকমের কোম্পানির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ফলাওভাবে বেআইনি কারবার চালাচ্ছে৷

পাক সামরিক গুপ্তচর বাহিনী নিজেদের কার্যকলাপের কোনও পাকা রেকর্ড রাখে না৷ কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্কের খোঁজ রাখে না৷ তারা জানে, দুনিয়াজোড়া পাপচক্র যে হাওলা কারবারের মাধ্যমে কাজকর্ম চালায়, তার মূল নিয়ন্তা এখন ডি কোম্পানি৷ কারণ, এই মুহূর্তে বিশ্বের আর কোনও মাফিয়া চক্রের এত পাকা বৈষয়িক বুদ্ধি নেই৷

হতে পারে দাউদ সম্পর্কে আইএসআই যত খবর রাখে তত খবর সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ইন্টেলিজেন্সের কাছে নেই৷ কিন্তু দাউদ ইব্রাহিম ও তার শাগরেদদের গতিবিধি তারা জানে না কিংবা তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোথায় কত ড্রাগ এবং কালো টাকা পাচার হয় আর সন্ত্রাসবাদীরাই বা কীভাবে তার একটি মোটা অংশ পায়, সে সম্পর্কে শেখশাহিগুলি একেবারেই জ্ঞানশূন্য— এ কথা বললে তো সন্ত্রাসদমন কর্মসূচিরই কোনও মানে হয় না৷ ‘বিসিসিআই’ শব্দটির অর্থ কি শেখশাহির কর্তারা ভুলে গিয়েছেন?

১৯৯৩ সালে মুম্বই বিস্ফোরণের পর থেকেই ভারত সরকার তথা গোয়েন্দা বিভাগ দাউদ সম্পর্কে আমেরিকার প্রশাসন এবং সেদেশের গোয়েন্দা কর্তাদের অনবরত সতর্ক করেছে৷ কিন্তু তাঁরা তখন তাদের বাড়তে দিয়েছিলেন৷ কারণ, পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ যে দাউদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা কর্তারা সেটা জানতেন৷ কেন নিয়েছে তা-ও জানতেন৷ তাই ভারত বারংবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তাঁরা সে কথায় কান দেননি৷ কানে জল ঢুকল বছর দশেক বাদে৷ মাঝখান থেকে লাভবান হল কারা?

আর সে কারণেই ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হচ্ছি৷ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সহ আরব শেখশাহিগুলি যদি সত্যিই ইসলামিক স্টেটের মতো সন্ত্রাসবাদীদের দমনে আগ্রহী হয়, তাহলে তারা যেন দাউদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও যথাবিধি স্বচ্ছতার সঙ্গে ভারতকে অবহিত করে৷ দুঃখের বিষয় হল, দাউদ নেটওয়ার্কের টোপ ভারতের বুকেও এমনভাবে ছড়ানো রয়েছে যেখানে অনেক ধুরন্ধর গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজনও তাতে ফেঁসে যান৷

স্রেফ লোভের বশে৷ পরিণামে ডি কোম্পানির পাইপলাইনকে কাজে লাগিয়ে সেই এক্স-সার্ভিসম্যানদের দিয়েই মতলব হাসিল করে সন্ত্রাসবাদীরা৷ ভারতের মতো দেশের বুকেই যেখানে এমন বিপদ সেখানে আরব শেখশাহিগুলির কাছ থেকে যদি উপযুক্ত সহায়তা না মেলে, তাহলে কোনও সন্ত্রাসদমন চুক্তি করেই উপযুক্ত ফল মিলবে না৷ উলটে কাজের চাইতে অ-কাজই হবে বেশি৷