সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: অনেক ঝড় দেখেছে শহর। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর ঝড় কবে দেখেছে তা ইতিহাস ঘেঁটে গোটা আরও দুয়েক এমন সাইক্লোনের তথ্য মিলছে। কিন্তু সেই সময়ে কোনও সাইক্লোনের নাম দেওয়ার কোনও নিয়ম ছিল না। এলাকাভিত্তিতে নাম হতো।

আইলা , লায়লা, বুলবুল, হুদহুদ, ফণী। কত নাম, কত তাণ্ডব। মহানগরে এমন ঝড়ের গল্প শুনেছে কিছু শহরের উপর দিয়ে বয়েও গিয়েছে কিন্তু এমন বুকে কাঁপিয়ে দেওয়া সাইক্লোন কাছে পিঠে নেই। খান তিনশো বছরে এমন ঝড় গোটা দুই। ১৭৩৭ সালের ১১ অক্টোবর রাতে কলকাতার বুকে আছড়ে পড়েছিল এক ভয়ঙ্কর সুপার সাইক্লোন এবং এই ঘূর্ণীঝড় ৩৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তান্ডব চালিয়েছিল।

অন্যমতে ১৭৩৭ সালের সুপার সাইক্লোনের তারিখ হল ৭ই অক্টোবর বা ৩০ শে সেপ্টেম্বর। এটি ক্যালকাটা সাইক্লোন নাম খ্যাত। ব্রিটিশরা তখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ না করায় এই তারিখের ভিন্নতা দেখা যায়।

এই ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচন্ড গতিতে কলকাতার বুকে আছড়ে পড়ে, সঙ্গে দোসর ছিল মুষলধারে বৃষ্টি ও ভূমিকম্প। ঘরদোর কাঁপতে থাকে, একের পর এক ঘড়বাড়ি ভেঙ্গে পড়তে থাকে, দোতলা তিনতলা বাড়ির দরজা জানলা ভেঙ্গে ছিটকে যেতে থাকে। সারা কলকাতা লন্ডভন্ড হয়ে যায়।

গঙ্গার ঢেউ ৪০ ফুট উঁচু হয়ে সব ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং ৬ ঘন্টায় ৩৮১ মিলিমিটার বৃস্টিপাত হয়েছিল। তখন গঙ্গা থেকে একটি খাল এখনকার ওয়েলিংটন স্কোয়ার হয়ে ক্রীক রো বরাবর সল্ট লেকে গিয়ে পড়ত। ঝড়ের আগের দিন গঙ্গায় ২৯ টি নৌকো জাহাজ নোঙ্গর করেছিল। সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ছোট খাট জেলে নৌকা ডিঙ্গি ঝড়ের ধাক্কায় গঙ্গা থেকে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের ঘূর্ণীতে এসে ক্রীক খালে ভেঙ্গে পড়েছিল। সেজন্য এই এলাকার নাম হয়েছিল ডিঙ্গাভাঙ্গা পল্লি। পরে ক্রীক খাল ভরাট করা রাস্তার নামকরণ করা হয় ডিঙ্গা ভাঙ্গা লেন।

এই মহা প্রলয়ে প্রায় কুড়ি হাজার নৌকা জাহাজ বজরা জেলে ডিঙ্গি বোট ইত্যাদি ধংস হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিউটি কালেক্টর টমাস জোশুয়া মুর কলকাতার এই সাইক্লোন নিয়ে তাঁর সরকারি রিপোর্টে লিখেছেন, ‘ঝড়ে কলকাতার সমস্ত মাটির বাড়ি ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল , এবং তিন হাজার বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছিল। মার্চেন্ট শিপ এর রিপোর্টে ঐ ঘুর্ণীঝড়ে ২০ হাজার নৌকা-জাহাজ ধংসের সঙ্গে তিন লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।’

৫ ই অক্টোবর ১৮৬৪ সালের সাইক্লোন আছড়ে পড়েছিল সকাল দশটায়। প্রবল ঘূর্ণীঝড় যখন সমুদ্র থেকে গঙ্গার বুকে আছড়ে পড়েছিল, তখন গঙ্গার জল ফুলে ফেঁপে ৪০ ফুট উঁচু হয়ে দুকুলের সমস্ত জনপদ, গাছগাছালি, মানুষ, গৃহপালিত পশু সব ভাসিয়ে নিয়ে কলকাতায় প্রবেশ করেছিল।

এই মহাপ্রলয়ে ১০০টি পাকা বাড়ি , হাজার হাজার টালির বাড়ি, মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, কলকাতা বন্দরে থাকা ১৯৫ টি জাহাজের মধ্যে ১৭২টি ধংস হয়ে গিয়েছিল, বিস্তীর্ণ এলাকায় ৩লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। ঘূর্ণিঝড়ে হিজলি এবং খেজুরী বন্দর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।