সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : শহরে সাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে করোনা উত্তর সময় থেকেই লড়াই করছেন কলকাতার সাইকেল প্রেমী মানুষরা। এবার সেই বার্তা নিয়ে তাঁরা দ্বারস্থ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। রাখছেন বেশ কিছু দাবী এবং দিচ্ছেন যুক্তিও।

শহরের সাইকেল প্রেমীরা করোনা সমস্যা শুরুর আগে বারবার বলে এসেছেন শহরের মাত্রাতিরিক্ত দূষণ কমাতে গেলে সাইকেল নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা উচিৎ সরকারের। এবারে দূষণ ও সামাজিক দূরত্ব বৃদ্ধির যুক্তিসহ সাইকেল নিয়ে ভাবনার দাবি জানালেন সাইকেল যোদ্ধারা। কলকাতার বাইসাইকেল মেয়র এবং হাওড়ার বাইসাইকেল মেয়র দুজনে একত্রে জানাচ্ছেন, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমরা এই করোনার সময়ে সাইকেল কতটা বেশি সাহায্য করতে পারে রাস্তায় ফিজিক্যাল ডিস্টেন্স বজায় রাখতে। সাইকেলের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ‘BYCS’-এর প্রতিনিধিরা কলকাতায় সাইকেল লেন বৃদ্ধি, সাইকেল বর্জিত অঞ্চল কমিয়ে দেওয়া, সাইকেল সারাইয়ের স্থান, সাইকেল স্ট্যান্ড নিয়ে দাবিও জানিয়েছে তাদের চিঠিতে।’

তাঁরা মনে করছেন, ‘বহু মানুষ সংক্রমণ এড়াতে সাইকেল বেছে নিচ্ছেন এখন। পৃথক লেন চিহ্নিত করে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দিক সরকার। সাইকেল সহজ, সাশ্রয়কারী, দুষণবিহীন যান। আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় তা অগ্রাধিকার পাক। সারা পৃথিবী এই পথে হাঁটছে লকডাউনের পর। সেই পথে হাঁটুক বাংলাও।’

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ‘প্রতিটি সংকটেই তৈরি হয় কিছু কিছু সমস্যার নতুন সমাধান সূত্র। অতিমারীর সংকটে অভিজ্ঞ মানুষজন দৈহিক দূরত্বের সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে রেহাই পেতে মোটর সাইকেল অথবা বাই সাইকেলের ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়াবে বলেই আশা করা যায়। চিনের সমীক্ষায় প্রকাশিত যে লকদাউনের আগে পরে মোটর সাইকেল আরোহীর সংখ্যার তেমন কোন পরিবর্তন ঘটছে না। পাশাপাশি নিউইয়র্ক টাইম্‌স-এ প্রকাশিত যে শিকাগো ও নিউইয়র্ক শহরে এই পর্যায়ে সাইকেল আরোহীর সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে ১০০ শতাংশ ও ৬৭ শতাংশ। বিশেষত কলকাতার মত শহুরে এলাকায় যেখানে গড়ে প্রতিদিন মানুষের ট্রিপের দূরত্ব পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের মধ্যে সেখানে চলার পথ পেলে এই পরিস্থিতিতে সাইকেলের প্রভাব বাড়তে বাধ্য। আর এক্ষেত্রে কম খরচের পাশাপাশি বাড়তি সুবিধা হল চালক ও সহযাত্রী একে অপরের পরিচিত এবং আস্থা ভাজন। ফলে সংক্রমণের আশংকার প্রভাব মুক্ত হয়েই চলতে পারে এই ব্যাবস্থা সফল ভাবেই। কিন্তু এক্ষেত্রে এখন থেকেই প্রয়োজন মুল রাস্তাগুলি বাদ দিয়ে শহরের বেশ কিছু নির্দিষ্ট রাস্তায় নিরাপদে সাইকেল চালানোর বিধি ব্যাবস্থা। এসবের পাশাপাশি যান বাহনে সংক্রমণে ভয়ের কারণে লকডাউন পরবর্তীতে মানুষের স্বল্প দূরত্বের পথে হেঁটে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়বে, যেটি এক অর্থে মানুষের সুস্বাস্থ্যের সহায়ক হবে। তবে সেক্ষেত্রেও প্রয়োজন নিরাপদে হেঁটে চলার ফুটপাথ। এক্ষেত্রে পৌরসভাগুলিকে আপতকালিন ভিত্তিতে কার্যকরী ভুমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় গন পরিবহনের খামতি পোষাতে শহরের মধ্যবিত্ত গাড়ি হাঁকিয়ে ভরিয়ে তুলবে রাজপথ, যার পরিনতি সেই বায়ুর আর শব্দের দূষণ যা ভাইরাসের মতোই ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে কুরে কুরে খাবে শহরের জীবনকে। এখন প্রয়োজন মানুষের বাঁচার তাগিদে ব্যতিক্রমী সময়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত।’

কলকাতার আরও এক সাইকেল সংগঠন কলকাতা সাইকেল সমাজ জানাচ্ছে, ‘পাবলিক ভেহিকেলর জন্য ১/৩ভাগ, সাইকেলের জন্য ১/৩ ভাগ বাকি ১/৩ ভাগ অন্যান্য যানবাহনের জন্য রাখলে কলকাতার রাস্তা ট্রাফিকের তুলনায় বেশি চওড়া মনে হবে। তাঁদের দাবি, ‘আমরা এই দূষণ থেকে মুক্তি চাই। দূষণের মূল উৎস এই সব ডিজেল, পেট্রোল , কেরোসিন চালিত গাড়ি। গাড়ি ছাড়তে হবে। কষ্ট হলেও ছাড়তে হবে। তার জন্য যা পরিকল্পনা প্রয়োজন নিতে হবে। মানুষকে সাইকেল চাইতে হবে। না হলে হবে না।’

কলকাতার 'গলি বয়'-এর বিশ্ব জয়ের গল্প