অরুণাভ রাহারায়, আলিপুরদুয়ায়ার: পাহাড়ের বুকে ব্রিটিশদের বানানো জেলখানা। এখানে প্রচুর স্বাধীনতা সংগ্রামী বন্দি ছিলেন একটা সময়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও জেলখানাটা থেকে গিয়েছিল। সেই সময় কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে বেশ কয়েকজনকে এই জেলখানায় আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিনয় চৌধুরী। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।

আরেকজন বন্দির নাম সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তিনি তখন ১৪ বছরের বালক। পরে ‘পদাতিক’ কবি হিসেবে সুপরিচিত। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বক্সা ফোর্টকে বলেছিলেন, ‘মেঘের গায়ে জেলখানা’। দুঃখের বিষয় ঐতিহ্যসম্মত এই প্রাচীন দুর্গটির এখন বেহাল দশা। বহু বছর ধরে সংস্কার করার কথা শোনা গেলেও আজ পর্যন্ত তা হয়নি। কবি এবং আলিপুরদুয়ায়বাসী উত্তমকুমার মোদকের কলমে বক্সা বন্দি শিবিরের নির্মম ছবি ফুটে উঠেছে এইভাবে:

“ঠায় দাঁড়িয়ে দুর্গটি ওই বট-পাকুড়ের ছায়ায়
ভেঙে গেছে কত প্রাচীর তবুও তার মায়ায়
ভাসছে কথা ইতিহাসের ঘন সবুজ নিবিড়
স্বাধীন দেশে ব্রাত্য আজও বক্সা বন্দি শিবির”

 

 

ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ঘোষণা হয়েছে বহু দিন আগেই। তার ৩৮ বছর পরেও বক্সা রাজবন্দি নিবাস সংস্করণের কাজ শুরু হয়নি। সমতল থেকে ২৬০০ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থিত এই দুর্গটি বর্তমানে কোনও রকম ভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। সংস্কার বলতে হয়েছে শুধু বাইরের দেওয়াল জুড়ে রঙের প্রলেপ। বসেছে কিছু দোলনা। ফলে ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধটি এখন কেবলই বিনোদনের পার্ক।

আলিপুরদুয়ার থেকে বারংবার পাহাড়ের নানা গ্রামে ছুটে যাওয়া মানবাধিকারকর্মী সুমন গোস্বামী kolkata24x7-কে বলেন, “আন্দামানের সেলুলার জেল সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু, বক্সা ফোর্টকে সংরক্ষণ করার চেষ্টাই হয়নি কোনও দিন। ১৯৯৩ সালের বন্যার পর এই স্মৃতিসৌধের ৭০ শতাংশ ধ্বসে যায়। পড়ে থাকে ৩০ শতাংশ। সেই ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ করার জন্য কোনও দিন সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বাইরে রং হয়েছে। ভেতরে দোলনা বসেছে। একটি স্মৃতিস্তম্ভ বসেছে। ফলে বক্সা ফোর্ট এখন হয়ে উঠেছে পার্ক। কিন্তু, যে তিনখানা সেল টিকে ছিল সেগুলো ভেঙে পড়ে গিয়েছে। এখন সামান্য একখানা সেল টিকে আছে। বাকিগুলোর অবস্থা খারাপ। সেটার ইমেডিয়েট সংস্কার করা উচিৎ। এরপর শুধু দোলনাগুলোই থাকবে, স্মৃতিসৌধটি সম্পূর্ণ ধ্বসে যাবে।”

 

 

বহুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে, সান্তালাবাড়ি থেকে বক্সাদুয়ার সদর বাজার পর্যন্ত যাওয়ার রোপওয়ে চালু হবে। কিন্তু, তাতে পাহাড়বাসীদের কোনও লাভ হবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তাঁদের মতে, যেখানে রাস্তা নেই, সেখানে রোপওয়ে বসানোর মানে কী? ওপরে ১৩ টা গ্রাম রয়েছে। গ্রামগুলো জুড়ে থাকেন কয়েক হাজার মানুষ। গাড়ি চলাচলের রাস্তা থাকলে সাধারণ মানুষের সুবিধে হত। তাঁরা প্রাইমারি হেলথ সেন্টার পেতে পারত। বক্সার ওপরে কারোর শরীর খারাপ হলে, চিকিৎসার অভাবে মানুষ মরে যায়। সেখানকার স্কুলে কোনও মাস্টারমশাই নেই, ভালো যাতায়াতের ব্যবস্থা নেই বলে। সুতরাং রাস্তার ব্যবস্থা না-করে রোপওয়ে চালু করার কোনও মানে নেই। রোপওয়ে চালু হলে পর্যটকদের সুবিধে হবে, সাধারণ মানুষের বিশেষ সুবিধে হবে না।

বক্সা বন্দি শিবির নানা কারণে ঐতিহাসিক। ১৯৩১ সালের ২৫ শে বৈশাখ বক্সা দুর্গে রবিঠাকুরের জন্মদিন পালন করেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেড়াতে এসেছেন উত্তরবঙ্গের দার্জিলিঙে। রাজবন্দিরা তাঁকে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। কবি ১৯ জ্যৈষ্ঠ প্রত্যাভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন দুই লাইনের কবিতার মধ্যে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতা শ্বেত পাথরে খোদাই করে রাখা হয়েছে বক্সা দুর্গের সামনে।

 

 

এত কিছুর পরেও বক্সা ফোর্ট কেন অবহেলিত, সেই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে নানা মহলে। আগের আমলের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ফি বছর উত্তরবঙ্গের হলং বনবাংলে বেড়াতে আসতেন। জ্যোতি বসু একবার বক্সা দুর্গ দেখাতে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। তিনি অরণ্য-সফর সেরে ফিরে যেতেন কলকাতায়। বক্সা ফোর্ট পড়ে থাকত অন্ধকারেই। তারপর পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু প্রতিশ্রুতির পাহাড়ে হয়নি কোনও কাজ। স্থানীয়দের কথায়, বক্সা ফোর্টের সংরক্ষণ করা হলে এই এলাকায় পর্যটকের ঢল মানবে। কিন্তু, আগের সরকারের মতোই বর্তমান শাসক দল বক্সায় উন্নতির ব্যাপারে উদাসীন।

প্রতি বছর ১৫ আগস্ট বক্সা দুর্গে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বছরের এই একটা মাত্র দিন সান্তালাবাড়িতে লালবাতি গাড়ির ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশিষ্ট মানুষেরা যান বক্সা পাহাড়ে। তাঁরা ঘোষণা করেন, দুর্গের সংরক্ষণ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠে না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে তৈরি করা হয়েছিল স্মৃতি-স্মারক। সেই স্বারকও ধ্বসে পড়েছে বহু দিন হল।

 

 

প্রায় দু’দশক আগে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ থেকে কালচিনি পঞ্চায়েত সমিতিকে ২৭ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় দুর্গটির সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু, তার পরেও কোনও রকম কাজ শুরু হয়নি। দুর্গের কোনও ঘরই আজ আর অক্ষত অবস্থায় নেই। তবুও বক্সা ফোর্ট ঘিরে স্বপ্ন দেখেন স্থানীয় মানুষ ইন্দ্রশঙ্কর থাপা। তিনি বক্সাদুয়ার সদর বাজারে ‘রোভার্স ইন’ নামের একটি হোম স্টে গড়েছেন।

তিনি জানান, এই নামটি দিয়েছিলেন আলিপুদুয়ারের প্রকৃতিপ্রেমিক তথা কবি জগন্নাথ বিশ্বাস। ইন্দ্র বাবু ছোটবেলা থেকে শুনে আসছেন বক্সা দুর্গ সংস্করণ হবে। কিন্তু, তিনি এখন বয়সের দিক থেকে ৬০-এর ঘরে পৌঁছলেও দুর্গটি সংরক্ষণের ব্যাপারে উদ্যোগী হয়নি পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এ জন্য তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আগামী দিনে বক্সা ফোর্ট মাথা তুলে দাঁড়াবে কিনা, সেদিকেই তাকিয়ে আছে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।