প্রদ্যুত দাস: জলপাইগুড়ি: কুয়াশা জড়ানো নতুন সকালে যখন সূর্য তার মৃদু আলোর রশ্মিগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে—পাখপাখালিরা পালক ফুলিয়ে শরীরে টেনে নিচ্ছে উষ্ণতার ওম৷ গাছেদের পাতায় পাতায় কেমন এক শিরশিরানি—ইউক্যালিপটাসের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশের গায়ে ঘুমন্ত পাহাড়৷ পাহাড়ের কোলে ছোট্ট এক আড়ম্বরহীন স্নিগ্ধ আলো—সব মিলিয়ে এই শীত সকাল যেন এক হাতে আঁকা ছবি।

পৌষ মাস বলে কথা। নতুন চালের গন্ধ, খেজুড় গুড় পাটালি—এ সব না হলে কি বাঙালির পৌষ -পার্বণ জমে? তবে এখন হল গিয়ে টাইম ম্যানেজমেন্টের যুগ। এখন কি আর শিলনোড়ায় চাল বেটে, ধৈর্য ধরে চাটুতে সরুচাকলি বা পাটিসাপটা তোলার সময় আছে—যার ভেতরে আবার প্রথম দু’দিনটে ভাল উঠবে না?

এখন মিক্সিতে ফটাফট চাল গুঁড়িয়ে, নন-স্টিকিং তাওয়ায় চটজলদি পাটিসাপটা। অবশ্য নারকেলটা সেই কুরুনিতেই কুড়িয়ে নিতে হবে। নারকেল কুড়োনোর মেশিন বাজারে এসেছে কি না জানা নেই। তা সে যাই হোক, সময় যতই এগিয়ে যাক, যতই পিৎজ্জা-বার্গার বাজার দখল করুক, পিঠে-পুলি আছে সেই পিঠে-পুলিতেই৷ আদি ও অকৃত্রিম বাঙালির কাছে পিঠে পুলির স্বাদই আলাদা।

মা-ঠাকুমা-দিদিমাদের হাতের বড় চাটুর মাপের সেদ্ধ পুলি আর ঝোলা গুড় কিংবা দুধ পুলি। মায়ের হাতের পাটিসাপটা নারকেলের পুর দিয়ে—অসাধারণ। সেই যে ছোটবেলায় সবাই মিলে গোল হয়ে বসে পিঠের স্বাদ নেওয়া। সে অনন্য স্বাদ ভুলতে পারা যায়?

পিঠে-পুলি মানেই আদরের, স্নেহের আর ভালবাসার স্পর্শ। খাওয়ার সঙ্গে এই মধুর পরশটুকু জুড়ে থাকত বলেই যেন তা হয়ে উঠত তুলনাহীন। বাঙালির পৌষ পার্বণের মেলবন্ধন।

 

গতির এই যুগে জলপাইগুড়ি শহরের ডিবিসি রোডের এক মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ফি বছরের মতো এবছরেও পিঠে পুলির পসরা নিয়ে হাজির হয়েছেন। রমরমিয়ে বিকোচ্ছে রকমারি স্বাদের সব পিঠে পুলি। দুধ পুলি, পাটি সাপটা, মুগের পুলি, মালপো, রস বড়া সহ নানান স্বাদের পিঠে পুলির বিকিকিনির আসর রীতিমত জমজমাট ।

বিক্রেতা বাবু ঘোষের মুখে চওড়া হাসি। তিনি বলেন, ” স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের দিয়ে এই পিঠে পুলি তৈরি করা হয়েছে।” ক্রেতারা জানান, “গতির এই যুগে এই ধরনের পিঠে পুলির সম্ভার অভিনব। আমরা খুশি। দামও সকলের আয়ত্তের মধ্যেই আছে।”

 

তাই খাও বাঙালি খাও৷ পৌষের স্বাদে জিভের রসনাতৃপ্তি হোক, সাধ মিটিয়ে সাধ্যের মধ্যে উদরপূর্তির সাথে মননও পরিতৃপ্ত হোক পিঠেপুলির স্বাদে৷