স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: সদ্যোজাত সন্তানকে ডাস্টবিন বা নর্দমায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়৷ এছাড়াও কিছুদিন আগে কলকাতার হরিদেবপুরে ব্যাগ ভরতি সদ্যোজাত শিশু ও ভ্রূণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটার ঘন্টা খানেক পরই আগের বিবৃতি তুলে নেয় কলকাতা পুলিশ৷ পরে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যাগগুলিতে ভ্রূণ বা শিশুর মৃতদেহ নয়, তাতে ছিল মেডিকেল বর্জ্য ও ড্রাই আইস৷ এই ঘটনার পর বলা যেতে পারে পূর্ব বর্ধমান জেলায় শিশু সুরক্ষা দফতর যত্রতত্র সদ্যোজাত ফেলে দেওয়া আটকাতে পদক্ষেপ নেয়৷

আর তা আটকাতে রাজ্যের মধ্যে প্রথম পূর্ব বর্ধমান জেলা শিশু সুরক্ষা দফতর নতুন উদ্যোগ নেয় গোটা জেলা জুড়ে। চালু হতে চলেছে ‘ক্রেডল বেবি ইউনিট’ বা ‘বাচ্চা শিশুর অভ্যর্থনা কেন্দ্র’। সরকারি জেলা হাসপাতাল সহ বেসরকারি হাসপাতাল এবং ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকে নিয়ে এক যোগে এই নয়া অভিযানে নামতে চলেছে এই দফতর।

বেশ কিছুদিন ধরেই এই বিষয়ে পরিকল্পনা করা হলেও সম্প্রতি কাটোয়ায় মাত্র ছ’দিনের প্রতিবন্ধী শিশুকন্যাকে তার মা গঙ্গায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে৷ তা সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন। একদিকে যেমন এই ধরনের ঘটনা আটকাতে মনস্তত্ত্ববিদদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে৷ তেমনি যে সমস্ত মায়েরা তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানদের গ্রহণ করতে চাইছেন না সেই সমস্ত শিশুদের যাতে ঝোপ, জঙ্গল, নালা-নর্দমায় ফেলে দেওয়া না হয় তা দেখা হবে৷ সেজন্য ইতিমধ্যেই ‘সা’ উদ্যোগ নিলেও এবার সমস্ত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও একই পদ্ধতি নিতে চলেছে জেলা শিশু সুরক্ষা দফতর।

 

উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী শিশু জন্মানোয় কাটোয়ায় ছ’দিনের শিশুকন্যাকে ভাগীরথীর জলে ফেলে দেয় কাটোয়া ১ ব্লকের মোস্তাফাপুর গ্রামের বাসিন্দা সদ্যোজাত সন্তানের মা-বাবা সহ পরিবারের লোকজন৷ গত শনিবার এই ঘটনা ঘটায় ব্যাপক উত্তেজনা চড়ায় গোটা এলাকায়৷ পরে ভাগীরথীর জল থেকে রতন শেখ নামে এক মাঝি ওই সদ্যোজাত সন্তানকে উদ্ধার করে৷ পরে পুলিশ শিশুটিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে ভরতি করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা শিশুটির মা-বাবা পরিবারের লোকজনদের ধরে এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আটকে রাখেন। পরে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পুলিশ ওই শিশুর মা-বাবা সহ পরিবারের মোট পাঁচজন সদস্যকে গ্রেফতারও করেছে। তাদের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা সহ বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।

পূর্ব বর্ধমান জেলা শিশু সুরক্ষা প্রকল্পের আধিকারিক সুদেষ্ণা মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘অনেক দিন ধরেই ‘স্পেশালাইজেশন এডপশন এজেন্সি’ বা ‘সা’ এই ধরনের বাচ্চা শিশুর অভ্যর্থনা কেন্দ্র বা ইউনিট চালু করেছে। এবার সেই একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করে পূর্ব বর্ধমান জেলা সমাজকল্যাণ দফতর তথা শিশু সুরক্ষা প্রকল্প দফতর চালু করতে চাইছেন এই ধরনের ইউনিট।’’

তিনি আরও বলেছেন, ‘‘ইতিমধ্যেই জেলার সমস্ত হাসপাতালের তালিকা তারা সংগ্রহ করছেন। এরপর আগামী ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে তারা হাসপাতালের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করবেন।’’ উল্লেখ্য, বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, গড়ে বছরে ১০ থেকে ১২ টি করে সদ্যোজাত শিশুকে হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে যান মায়েরা। ফলে সমস্যায় পড়েন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরেও বেশ কয়েকটি শিশু প্রতিপালিত হচ্ছে বর্ধমান হাসপাতালে।

এরই পাশাপাশি গোটা জেলা জুড়ে প্রায়শই ঝোপ-জঙ্গল, নালা-নর্দমার ধার থেকে সদ্যোজাতদের কখনও জীবন্ত কখনও মৃত অবস্থায় উদ্ধারের খবর মেলে। এই ধরনের ঘটনায় সমাজ জীবনে একটা বিরূপ ছাপ পড়ছে। আর এগুলিকে আটকাতেই এই নতুন অভিযান শুরু হচ্ছে। এই অভিযানের অঙ্গ হিসাবে যে সমস্ত মায়েরা তাঁদের সন্তানদের নিতে চান না, তারা সরকারি নিয়ম মেনে হাসপাতালে সন্তানদের দিতে পারবেন। এই ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তোলা হবে।

সুদেষ্ণা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, অনেক সময়ই মায়েরা লোকলজ্জা এবং সম্মানের ভয়ে শিশুদের বিপদের মুখে ফেলে চলে যান। তাই সরকারি হাসপাতাল, ব্লক স্বাস্থ্য ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং হাসপাতালগুলিতে একটি করে বিশেষ শিশু বেড সহ একটি করে এই ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ইউনিটে কেউ শিশুদের রেখে যাওয়ার নির্দিষ্ট কয়েক মিনিট পর তা জানতে পারবেন কর্তৃপক্ষরা। দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা থাকছে সেখানে। বিশেষ ভাবে সদ্যোজাত শিশুদের উপযোগী করে তৈরি করা হবে এই বেড। যাতে সদ্যোজাতের শারীরিক কোনও সমস্যা না হয়।