ফাইল ছবি৷

বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- লোকসভা ভোটের নিরিখে বর্ধমান-দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বর্ধমান পুরসভা হাতছাড়া হল তৃণমূল কংগ্রেসের। ৩৫টি ওয়ার্ড বিশিষ্ট বর্ধমান পুরসভাকে নিয়েই বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভা গঠিত। পূর্ব বর্ধমান জেলার বর্ধমান-দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্রের অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভা আসনেই হেরে গোহারা হয়ে গেল তৃণমূল প্রার্থী। এই বিধানসভাতেই একদা সিপিএমের হেভিওয়েট প্রার্থী নিরুপম সেন জয়ী হয়েছিলেন। সেই নিরুপম সেনকে হারিয়ে রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় জয়ী হয়ে রাজ্যের মন্ত্রী হন। আর সেই বিধানসভার ৩৫টি ওয়ার্ডের ২১টি ওয়ার্ডেই হেরে বসে রইল তৃণমূল প্রার্থী।

মনে রাখার মত বিষয় হল – এবারের লোকসভা নির্বাচনে প্রতিটি বুথ থেকেই লিড দেবার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল তৃণমূলের পক্ষ থেকে। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল নিজের নিজের বুথে লিড দিতে না পারলে তাদের পদ বাতিলই নয়, ঢুকতেই দেওয়া হবে না তৃণমূল পার্টি অফিসে। তার সঙ্গে ছিল একাধিক দলীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে নিদান। পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রামে অনুব্রত মণ্ডল থেকে স্বপন দেবনাথ কেউই এই নিদান হাঁকতে বাদ রাখেননি। কিন্তু সবই বিফলে গেল গেরুয়া ঝড়ে।

আরও উল্লেখ করার মত বিষয় হল বর্ধমান দুর্গাপুর লোকসভার আসনটিকে রীতিমত পাখির চোখ করে তুলেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দোপাধ্যায়। এই লোকসভার নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজে তিনবার আসেন। আসেন দেবও। বর্ধমানের দলীয় পর্যবেক্ষক অরূপ বিশ্বাসও চষে বেড়িয়েছেন। কিন্তু কার্যত হাতে গোনা কয়েকটি ইস্যুই মানুষ তৃণমূলকে ব্রাত্য করে দিয়েছে। খোদ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারাই বলতে শুরু করেছেন – যেভাবে খোদ দলনেত্রী নির্বাচনী প্রচারে পাড়ার কচিকাচাদের ঝগড়ার ঢংয়ে মোদি অমিত শাহকে আক্রমণ করেছে্ন তা শিক্ষিত সমাজের ভ্রু কুঁচকে দিয়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে তৃণমূল নেতাদের বেপরোয়া তোলাবাজি, দাদাগিরি এবং ক্ষমতাকে অপব্যবহারের অভিযোগ। আরও অভিযোগ, বাম জমানায় সিপিএম নেতাদের মতই তৃণমূলের নেতারাও প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, পাড়ায় পাড়ায় যেভাবে তোলাবাজি শুরু করে দিয়েছে তাতেই তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। আর তারই প্রতিফলন ঘটেছে লোকসভার ফলাফলে।

বৃহস্পতিবারের ফলাফলে বর্ধমান-দুর্গাপুর লোকসভা আসনে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী সুরেন্দ্রজিৎ সিং অহলুবালিয়া। তিনি পেয়েছেন ৫ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৭৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের মমতাজ সংঘমিতাকে ২ হাজার ৪৩৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছেন ৫ লক্ষ ৯৫ হাজার ৯৩৭টি ভোট। এই কেন্দ্রে সিপিআই (এম) প্রার্থী আভাষ রায় চৌধুরী পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৩২৯টি ভোট। এই কেন্দ্রেও সরকারী কর্মীদের পোষ্টাল ব্যালটের ভোটের সিংহভাগ পেয়েছেন বিজেপি প্রার্থী।

পোস্টাল ব্যালটে হিসাব- বিজেপি প্রার্থীর পোষ্টাল ব্যালটের প্রাপ্ত ভোট ৯২৬টি এবং তৃণমূল প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ৩২৬টি ভোট। এই কেন্দ্রে নোটায় ভোট পড়েছে ১৮ হাজার ৫৪০টি।

বিধানসভা ভিত্তিক হিসাব-  বলা বাহুল্য, বর্ধমান-দুর্গাপুর লোকসভা আসনে ৭টি বিধানসভার মধ্যে ৪টি বিধানসভায় জিতেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তার মধ্যে খোদ বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থী জয়ী হয়েছেন ১৩৩৮ ভোটে, মন্তেশ্বরে ২৭ হাজার ৪৩০ ভোটে, বর্ধমান উত্তর বিধানসভায় ২৮ হাজার ৪৬ ভোটে এবং ভাতার বিধানসভায় ২৬ হাজার ৪৬৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, তৃণমূল প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন গলসীতে ৮ হাজার ৭২১ ভোটে, দুর্গাপুর পূর্ব আসনে ২৬ হাজার ৫৯১ ভোটে এবং দুর্গাপুর পশ্চিম আসনে ৪৯ হাজার ২৪৮ ভোটের ব্যবধানে। আর ৩৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বর্ধমান পুরসভা তথা বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভার ২১টি ওয়ার্ডে জয়ী হয়েছে বিজেপি প্রার্থী এবং ১৪টি ওয়ার্ডে জয়ী হয়েছে তৃণমূল প্রার্থী।

পূর্ব বর্ধমান জেলায় দুটি লোকসভা আসনে একটি তৃণমূল এবং একটি বিজেপি দখল করল।

বর্ধমান পূর্ব লোকসভা আসনে দ্বিতীয়বার জয়ী হলেন তৃণমূলের প্রার্থী সুনীল মণ্ডল। তিনি পেয়েছেন ৬ লক্ষ ৪০ হাজার ৮৩৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির পরেশচন্দ্র দাস পেয়েছেন ৫ লক্ষ ৫১ হাজার ৫২৩ ভোট। এই আসনে সিপিএম প্রার্থী ঈশ্বরচন্দ্র দাস পেয়েছেন ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ৯২০ টি ভোট। এই আসনে বাতিল হয়েছে ৩১৭টি ভোট। নোটায় ভোট পড়েছে১০ হাজার ৭৬০টি । টেণ্ডার ভোট পড়েছে ৫টি।

বিধানসভা ভিত্তিক হিসাব- বর্ধমান পূর্ব লোকসভা আসনে কাটোয়া বিধানসভায় হেরেছে তৃণমূল প্রার্থী। এখানে বিজেপি প্রার্থী পেয়েছেন ৮৯১৭৫টি ভোট এবং তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছেন ৮৭৩১৬টি ভোট। পোষ্টাল ব্যালটের ভোটেও জিতেছেন বিজেপি প্রার্থী। তিনি পেয়েছেন ৮৫২টি ভোট। অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী পোষ্টাল ব্যালটের ভোট পেয়েছেন ৩৪৪টি ভোট। কার্যত সরকারী কর্মীদের সিংহভাগ সমর্থন পেয়েছেন বিজেপি প্রার্থী পরেশচন্দ্র দাস। অপরদিকে, এই লোকসভা আসনের মধ্যে জামালপুর বিধানসভায় ৩ হাজার ৬৮৪ ভোটে, কালনায় ৩ হাজার ৬৩৩ ভোটে, মেমারীতে ৪ হাজার ৮৯৯ ভোটে, পূর্বস্থলী উত্তর বিধানসভায় ২ হাজার ৭০৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী। এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী বেশী ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন রায়নায় ৫৪ হাজার ৮৪৯ ভোটের ব্যবধানে এবং পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভায় ২১ হাজার ৯০৮ ভোটের ব্যবধানে।

উল্লেখ্য, ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে সুনীলবাবু পেয়েছিলেন ৫ লক্ষ ৭৪ হাজার ৫৬০টি ভোট, বিজেপি প্রার্থী সন্তোষ রায় পেয়েছিলেন ১লক্ষ ৭০ হাজার ৮২৮টি ভোট এবং সিপিএম প্রার্থী ঈশ্বরচন্দ্র দাস পেয়েছিলেন ৪ লক্ষ ৬০ হাজার ১৮১টি ভোট। এরই পাশাপাশি বোলপুর লোকসভার অন্তর্গত পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থী অসিত মাল ২৭ হাজার ৫১৪ ভোটে, মঙ্গলকোটে ২৯ হাজার ২২৭ ভোটে এবং আউশগ্রামে ১৪হাজার ৮৬৮ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী রামপ্রসাদ দাসকে।

এই লোকসভা আসনেও পোষ্টাল ব্যালটের সিংভাগ পেয়েছেন বিজেপি প্রার্থী। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১৩২৪টি এবং তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছেন ৭৩০টি ভোট। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর লোকসভার অন্তর্গত বর্ধমানের খণ্ডঘোষ বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থী শ্যামল সাঁতরা ৩০ হাজার ৯৯৪ ভোটের ব্যবধান গড়েছেন বিজেপি প্রার্থী সৌমিত্র খাঁয়ের বিরুদ্ধে। যদিও এই লোকসভা আসনে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী সৌমিত্র খাঁ।