বর্ধমান: নব কৈলাশ মন্দির বা ১০৮ শিবমন্দির হল বর্ধমান জেলার কালনার আকর্ষণীয় শিব মন্দির। এই মন্দিরের অর্ধেক শিবলিঙ্গ কৃষ্ণবর্ণের এবং অর্ধেক শিবলিঙ্গ শুভ্রবর্ণের। মন্দিরের গায়ে রামায়ন-মহাভারত ও শিকারের কাহিনি চিত্রিত রয়েছে। তবে নামে একশো আট শিব মন্দির হলেও এখানে আছে একশো নটি মন্দির। তবে উল্লেখযোগ্য হল, সাদা ও কালো শিবলিঙ্গের সমাহার দেখতে পাওয়া যায়।

বর্ধমানের একশো আট মন্দিরের খ্যাতি এখন ভারত জোড়া। সারা বছর দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ভক্তরা এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন।লোকমুখে ১০৮ শিবমন্দির রূপে প্রচারিত হলেও কালনার এই মন্দিরের প্রকৃত নাম ‘নবকৈলাস মন্দির’। বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র ১৮০৯ সালে এই মন্দিরটি নির্মাণ করান। কথিত আছে, বিষ্ণুপুরে রাজকীয় সম্পত্তি স্থানান্তর ও মালিকানা উদ‌্‌যাপনের জন্য এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। নয় নয় করে দু’শো বছর পার করে ফেলা এই মন্দিরটি গঠনশৈলীতে বাংলার প্রখ্যাত আটচালা শিল্পের বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। সাদা এবং কালো শিবলিঙ্গ স্থাপনের কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলেন, সাদা রং ত্যাগের প্রতীক এবং কালো ভোগের প্রতীক। তাই দুই বিপরীত বোধ থেকে চৈতন্য বা জ্ঞানের উন্মেষ ঘটানোর জন্য সাদা এবং কালো শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা।

এও কথিত আছে যে, বর্ধমানের নবাবহাটে প্রায় দুশো তিরিশ বছর আগে বহু অর্থ ব্যয় করে কেন এমন মন্দির গড়েছিলেন মহারানি? মহারানি বিষণকুমারীর বর্ধমানের নবাবহাটে ১০৮ শিবমন্দির প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এই মন্দিরের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে। শেষ হয়েছিল ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে। সেই সময় বর্ধমান সংলগ্ন নবাবহাট এলাকায় মহামারি দেখা দিয়েছিল। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। স্বজনদের হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিলেন এই এলাকার বাসিন্দারা। এলাকায় মন্দির গড়ে বাসিন্দাদের ঈশ্বরমুখী করে তাঁদের শোক ভোলাতে চেয়েছিলেন বর্ধমানের মহারানিমা। সেই ভাবনা থেকেই নবাবহাটে এই একশো আট শিব মন্দির গড়েন তিনি। মহাআড়ম্বরে সেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। জপমালার আদলে ১০৮টি এবং অতিরিক্ত আর একটি, মোট ১০৯টি স্থাপত্যকে গেঁথে প্রতিষ্ঠা করা হয় এই মন্দির। এই মন্দিরমালা বর্ধমানের এক অনন্য শিল্পকীর্তি। এই ১০৯তম মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে লক্ষ সাধুর উপস্থিতি ঘটেছিল। তাঁদের পদধূলি রাজপরিবার একটি সোনার কলসিতে সংরক্ষণ করে রেখেছিল।

কালনা রাজবাড়ি চত্বরের দক্ষিণ দিকে প্রধান প্রবেশদ্বারের রাস্তার বিপরীতে অবস্থিত ১০৮ শিবমন্দির দু’টি বৃত্তকে কেন্দ্র করে নির্মিত। প্রথম তথা বাইরের বৃত্তে ৭৪টি মন্দিরে পর্যায়ক্রমে একটি সাদা এবং একটি কালো এবং দ্বিতীয় তথা ভিতরের বৃত্তের ৩৪টি মন্দিরের সবক’টিতেই সাদা শিবলিঙ্গ আছে। অর্থাৎ, মোট ৭১টি সাদা ও ৩৭টি কালো শিবলিঙ্গ। দ্বিতীয় বৃত্তের শিবলিঙ্গগুলি প্রথম বৃত্তের থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট। বৃত্তের মধ্যের মন্দিরগুলি আটচালা। চারচালার উপরে ক্ষুদ্রাকৃতি আর একটি চারচালা। উচ্চতা প্রায় কুড়ি ফুট এবং প্রস্থে সাড়ে ন’ফুট। প্রথম বৃত্তের ভিতর দিকের পরিধি প্রায় সাতশো ফুট এবং দ্বিতীয় বৃত্তের ভিতর দিকের পরিধি তিনশো ফুটের একটু বেশি।

ভিতরের বৃত্তের মাঝখানে রয়েছে একটি বিরাট কূপ। কথিত আছে, এখানে গর্ত করে একটি বড় কম্পাস বসিয়ে জ্যামিতিক ভাবে বৃত্ত মেপে নির্মাণ করার জন্য এই কূপ খনন। কারও মতে, এই বৃহৎ কূপটি শূন্য তথা নিরাকার ব্রহ্মস্বরূপ পরম শিবের প্রতীক। অন্য মতে, মন্দিরের পুজোর কাজে জলের চাহিদা মেটানোর জন্যই এই কূপ খনন করা হয়।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ