স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: দু’দিনের শিলাবৃষ্টিতে বাঁকুড়ার পাশাপাশি বর্ধমানের চাষিরাও বিপর্যস্তের মুখে পড়েছে৷ জেলা জুড়ে আলু ও পেঁয়াজ সহ বেশ কয়েকটি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷ এর জেরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল জেলার কৃষক মহলে৷

জেলা কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ধমানের চারটি ব্লকে শিলাবৃষ্টির প্রকোপ ব্যাপকভাবেই পড়েছে। ফলে ওই চারটি ব্লকে আলু, পেঁয়াজ, আম ও সজনেতে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সোমবার গভীর রাতে পূর্ব বর্ধমান জেলার মেমারী ১ ও ২, বর্ধমান সদর এবং কালনায় ব্যাপক শিলাবৃষ্টির খবর পাওয়া গিয়েছে। প্রতিটি ব্লক কৃষি আধিকারিককে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। সেই রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কতটা ক্ষতি হয়েছে তা বলা সম্ভব নয়।

জেলার ২৩টি ব্লকের মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্লকে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির জল আলু জমিতে জমা রয়েছে। দ্রুত সেই জল বার করে দিতে না পারলে আলুর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাষিদের এই জল দ্রুত বার করে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। এই শিলাবৃষ্টির পাশাপাশি প্রবল বৃষ্টির ঘটনায় রীতিমত মাথায় হাত পড়েছে চাষিদের।

বর্ধমান সদর ২নং ব্লকের চাষি কাবুল সাঁতরা জানিয়েছেন, এই বছর তাঁরা প্রায় আড়াই বিঘে জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। কিন্তু যেভাবে শিলাবৃষ্টির সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে তাতে মাটির তলার আলু পচে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের জমিতে আলু তুলতে এখনও প্রায় একমাস দেরি ছিল। এখনও আলু পোষ্টালো হয়নি। ফলে গোটা জমির আলুই এই জলে নষ্ট হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

চলতি বছরে আলুর উৎপাদন আশাতিরিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে আলুর দামও রীতিমত নিম্নমুখী। খোলাবাজারে আলু ৫ থেকে ৬ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। এই অবস্থায় এবছর আলু চাষ নিয়ে রীতিমত সংকটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে চাষিদের। যদিও ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন আলু সরকারিভাবে কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ১০ লক্ষ মেট্রিক টন আলু কেনা হলেও পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আলু ব্যবসায়ীরা।

জেলার আলু ব্যবসায়ীদের একটি সম্মেলনও হয় বর্ধমান টাউন হলে। এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সরকার যে পরিমাণ আলু কিনতে চাইছেন, তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলার আলুকে বাইরে পাঠাতে না পারলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।

গতবছর ২০১৮ সালে গোটা রাজ্যে আলুর উত্পাদন ছিল ৯০ লক্ষ মেট্রিক টন। এবছর এখনও পর্যন্ত তাঁরা যা হিসাব পেয়েছেন তাতে গোটা রাজ্যে আলুর উত্পাদন হতে চলেছে ১ লক্ষ ১০ হাজার মেট্রিক টন। ফলে গোটা রাজ্যেই এবছর প্রত্যাশিত ফলনের থেকেও বেশি ফলন হওয়ার কথা। আর এর ফলেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতবছর যে আলু হিমঘরে মজুত ছিল তার সবটা এখনও বার করা হয়নি।

 

বাঁকুড়াতে ৬৭ হাজার প্যাকেট এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ১ লক্ষ ৭০ হাজার প্যাকেট আলু হিমঘরেই মজুত রয়েছে। রাজ্যে প্রায় ৫০০টি ছোট-বড় হিমঘর রয়েছে। কিন্তু আলুর ধারণ ক্ষমতা ৭০ লক্ষ মেট্রিক টন। ফলে সমস্ত হিমঘরে আলু পূর্ণরূপে ভরতি করে দিলেও উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন আলু। প্রতিদিন রাজ্যবাসীর খাওয়ার জন্য যে আলু প্রয়োজন হয় তা বাদ দিয়েও প্রচুর পরিমাণে আলু খোলা বাজারে পড়ে থাকবে।

চাষিরা আলুতে এলামাটি মিশিয়ে বাইরে পাঠাতেন। এই এলামাটি কোনো রাসায়নিক পদার্থ নয়। আলুর স্বাভাবিক রং-কে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সরকারিভাবে এলামাটি মেশানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ তাঁরা এই এলামাটি পরীক্ষা করিয়েছেন। তাতে কোনো রাসায়নিকের হদিশ মেলেনি। এই বিষয়ে ওই রিপোর্ট তাঁরা রাজ্য সরকারের কাছে পাঠাচ্ছেন। এই নিষেধাজ্ঞার জেরেই তাঁরা বাইরে আলু পাঠাতে পারছেন না। কারণ বাংলার আলুর রং ঠিক না থাকায় বাইরের রাজ্য তা কিনতে চাইছে না।

গতবছর আলুর উত্পাদন কম হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল। তাই গতবার ৫০০ টাকা দরে আলুর প্যাকেট হিমঘরে মজুদ করা হয়েছিল। সেখানে উত্তরপ্রদেশ ৪০০ টাকা দরে মজুত করেছিল। অথচ আলু বিক্রির সময় প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি বিহার, ঝাড়খণ্ড, আসাম প্রভৃতি যে সমস্ত রাজ্য অন্য রাজ্য থেকে আলু কেনে তাঁরা দাম কম থাকা এবং আলুর রং ও দেখতে ভালো থাকায় উত্তরপ্রদেশ থেকেই বেশির ভাগ আলু সংগ্রহ করে।