স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: মারণ করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন গোটা বিশ্ব। সেই করোনা মোকাবিলায় এবার আসরে নেমেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নির্দেশে এবার মাঠে নামল পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সের পর এদিন দুই জেলাতেই জরুরি বৈঠক করা হয়।

করোনা সতর্কতায় জেলার মেডিক্যাল কলেজ, জেলা হাসপাতাল সহ দুই জেলার সমস্ত মহকুমা হাসপাতালেও বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সচেতনতার জন্য বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসন। সেই সঙ্গে পূর্ব বর্ধমান জেলায় টোল-ফ্রি নম্বরও চালু করা হয়েছে।

করোনাভাইরাস নিয়ে এবার গোটা রাজ্য জুড়েই কড়া বার্তা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। শুক্রবার বিকালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সমস্ত জেলাশাসকদের নিয়ে তিনি বৈঠক করেন। পরে জেলাশাসকরা সংশ্লিষ্ট সমস্ত জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে এব্যাপারে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় কাজে নেমে পড়ার নির্দেশিকা জারি করলেন।

পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক বিজয় ভারতী জানিয়েছেন, এদিনই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এব্যাপারে সবরকমের সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। জেলাশাসক এদিন পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের সমস্ত দফতরের আধিকারিক, বেসরকারী নার্সিংহোম, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। বর্ধমান জেলায় কোনও করোনাভাইরাস আক্রান্তের খবর নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ২৭জন ভিনদেশ থেকে বর্ধমানে এসেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নজরদারি করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন তাঁদের বিষয়ে রিপোর্ট নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, সম্প্রতি চীন ও ভিয়েতনাম থেকে কিছু বাসিন্দা বর্ধমানে এসেছেন। তাঁদের ওপর এই নজরদারি করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, পূর্ব বর্ধমান জেলায় নোভেল করোনাভাইরাস নিয়ে অহেতুক আতংকিত না হবার জন্য জেলাবাসীর কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে। এরই পাশাপাশি ভাইরাস মোকাবিলায় সমস্ত রকম প্রাক্ প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কালনা ও কাটোয়ায় ১০টি আইসিইউ বেড তৈরি রাখা হয়েছে। শনিবার থেকেই জেলা জুড়ে অহেতুক আতংকিত না হবার জন্য বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিলি, ফ্লেক্স লাগাতে বলা হয়েছে। করোনা ভাইরাস কি, কি কি করণীয়, কি কি করবেন না প্রভৃতি নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে আগামী ১২ মার্চ পূর্ব বর্ধমান জেলায় স্বাস্থ্য দিবস পালন করার পাশাপাশি এই করোনা ভাইরাস নিয়েও প্রচার চালানো হবে। তিনি জানিয়েছেন, যে কোনও জ্বরই যে করোনাভাইরাস নয় এবং তা নিয়ে আতংকিত হবার কোনও কারণ নেই। সেটাই তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে করোনা বিরোধী প্রচারে আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, গ্রামস্তরের স্বাস্থ্য কমিটিগুলিকেও কাজে নেমে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিন জেলাশাসক বিজয় ভারতী বলেন, ”মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন করোনা ভাইরাসের জেরে কোনও চিকিত্সা কেন্দ্রেই অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া যাবে না। কোথাও কোনও রকমভাবে ওষুধ বা মাস্কের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলে তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশকে কড়া ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এব্যাপারে পুলিশকে নজরদারী করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে জেলা মুখ্য স্বাস্থাধিকারিককে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা জারি করার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার সমস্ত ডাক্তারদের একটি তালিকা এবং তাঁদের তৈরী রাখতে বলা হয়েছে। এরই পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদেরও এই কাজে লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারী হাসপাতালগুলিতে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থাকে মজুদ রাখতে বলা হয়েছে।”

তিনি আরও জানিয়েছেন, এন ৯৫ মাস্ক বর্তমানে জেলায় ২৫০টি রয়েছে। আরও ৩৫০টি শুক্রবারের মধ্যে চলে আসছে। পিপিই মজুদ রয়েছে ৯০টি। আরও ৫০টি আসছে। এছাড়াও ফিল্ড মাস্ক এখন মজুদ রয়েছে ৪০ হাজার, আরও ৪০ হাজারের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়াও ইনফ্রা থামোর্মিটার মজুদ রয়েছে ৫০টি । প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতিকে তৈরি থাকতে বলা হয়েছে। রেল ষ্টেশনগুলিতেও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রেলের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। তৈরি রাখা হয়েছে কুইক রেসপন্স টিমকেও। খবর পেলেই তাঁরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।

প্রসঙ্গত, জেলাশাসক জানিয়েছেন, সরকারি দফতরগুলিতে চালু থাকা বায়োমেট্রিক হাজিরার বিষয় নিয়ে এখনও কোনও নির্দেশিকা জারি হয়নি। নির্দেশিকা এলে তা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হতে পারে। ইতিমধ্যেই জেলায় করোনাভাইরাসের জন্য হেল্প লাইন চালু করা হয়েছে হেল্প নাম্বার গুলি হল- ০৩৪২ ২৬৬৫০৯২। এই নাম্বারে ২৪ ঘণ্টাই কথা বলা যাবে। এদিকে, শুক্রবার যখন জেলা প্রশাসন করোনাভাইরাসের আতংককে দুর করতে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই সময় খোদ বর্ধমান শহর জুড়ে বিশেষ করে এন ৯৫ মাস্ক নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। প্রচুর চাহিদা থাকায় খোলা বাজারে অমিল এখন এই মাস্ক। এছাড়াও থ্রি লেয়ার মাস্কও ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে বলে খবর মিলেছে।

খোদ দোকানদাররা জানিয়েছেন, প্রতিদিন তাঁদের কাছে শয়ে শয়ে মানুষ আসছেন মাস্কের জন্য, কিন্তু যোগান না থাকায় তাঁরা তা দিতে পারছেন না। এরই মাঝে যাঁরা যোগান পাচ্ছেন তাঁরা সুযোগ বুঝে দাঁও মারার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ। যদিও এব্যাপারে জেলাশাসক জানিয়েছেন, এরকম ঘটনা জানতে পারলে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।