যে কোনও আপদে-বিপদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে তাঁরা পাশে পাবেন? এটাই চান সাধারণ ভোটার। তবে আপদে-বিপদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে পাশে পাওয়ার দস্তুরটা যে ২০১১ সালে রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আমাদের এই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কার্যত অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, সে কথা অতি বড় তৃণমূল সমর্থক ও একান্ত আলাপচারিতায় স্বীকার করে নেন।

গৌতম রায়

এই দস্তুরের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পেলাম সম্প্রতি প্রাকৃতিক বিপর্যয় বুলবুলকে কেন্দ্র করে। রায়দিঘির বিধায়ক দেবশ্রী রায় এখনও খাতায়-কলমে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক। প্রকৃতির প্রলয় পর্বের গোটা সময়কাল জুড়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দেবশ্রী রায় অনুপস্থিত, অথচ ২০১১ এবং ২০১৬, এই দুটি নির্বাচনে রায়দিঘি থেকে যিনি পরাজিত হয়েছিলেন, সেই প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতা কান্তি গাঙ্গুলি কিন্তু শরীর, বয়েস– সমস্ত কিছুর বাঁধাকে অতিক্রম করে, দুর্গত মানুষদের সেবায় ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে, সবকিছু তদারকি করেছেন। শুধু তদারকি নয়, ‘বুলবুল’ আক্রান্ত মানুষদের সাময়িক পুনর্বাসনের জন্য, নিজের বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছেন।

তাঁর বাড়িতেই, থাকা-খাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করেছেন বুলবুল আক্রান্ত রায়দিঘি-সহ গোটা সুন্দরবনের প্রায় একটা বড় অংশের মানুষদের। কান্তিবাবুর বয়স ৭০ অতিক্রম করেছে। শারীরিকভাবে তিনি খুব একটা সক্ষম নন। বয়স ও বার্ধক্যজনিত নানা ধরনের সমস্যা তাঁর আছে। এসব কিছুর বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, যেভাবে তিনি তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিয়ে, বুলবুলের গোটা সময়কালটা জুড়ে, রায়দিঘি-সহ সুন্দরবনের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের জানমাল বাঁচানোর জন্য, জীবনকে তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তেমনটা কিন্তু আজকের দিনের বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর ভেতরে আমরা দেখতে পাই না।

কিছুদিন আগে এইরকম ঘটনা আমরা দেখেছিলাম রায়গঞ্জে তৎকালীন সংসদ মহম্মদ সেলিমকে কেন্দ্র করে। উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ বন্যার জেরে গোটা রায়গঞ্জ প্রায় ঢুকে গিয়েছিল। মহম্মদ সেলিম তাঁর জীবনকে তুচ্ছ করে, কখনও কলার ভেলায় চড়ে, কখনও দাঁড় টানা নৌকায় বসে, আবার কখনও দুটি বাসের সেতুকে অবলম্বন করে, বন্যাক্রান্ত মানুষদের কাছে নিজে পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থদের নিয়ে।

ত্রাণের তদারকি করেছিলেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ সংগ্রহ করেছিলেন। ত্রাণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমাজসেবী সংস্থার কাছে হাত পেতেছিলেন। মানুষদের পাশে সব সময় থেকেছিলেন। সেদিন কিন্তু রায়গঞ্জে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের প্রায় দেখতেই পাওয়া যায়নি। যেমনটা এখন দেখতে পাওয়া গেল না রায়দিঘিতে।

অতীতেও আমরা দেখেছি ২০০৯ সালে আয়লার সময় গোটা সুন্দরবন জুড়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষদের পাশে কিভাবে জীবন তুচ্ছ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন কান্তিবাবু। কেবল মাঠে ময়দানে বক্তৃতা, সেমিনারে বক্তৃতা, ফেসবুকে নিজের কথা বলাটাই যে রাজনীতির একমাত্র অধ্যায় নয়, ঝড়ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে, সামাজিক-প্রাকৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যে রাজনীতিকদের কাছে সব থেকে বড় সামাজিক দায়িত্ব, সেটা মহম্মদ সেলিম, কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মানুষরা যেভাবে দেখান, তা কিন্তু রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের একটি লোকের ভেতরের দেখতে পাওয়া যায় না।

অতীতে আমরা আয়লার সময় এমনটাই আমরা দেখেছি। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কোনও রকম আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ না করে একদম অটোরিকশায় চড়ে সাধারণ মানুষের কাছে, আয়লা ক্রান্ত মানুষের কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন তাঁদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনের জন্য।

সেদিন কিন্তু কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হিসেবে আজকের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে একাধিকবার অনুরোধ করেছিলেন, দাবি জানিয়েছিলেন যে; আয়লা জনিত কারণে যেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারকে একটি পয়সাও সাহায্য না করা হয়।

সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু আজকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুলবুল মোকাবিলার নাম করে, সারাদিন নবান্নের ঠাণ্ডা ঘরে আমলা পরিবৃত হয়ে তাঁবেদার সাংবাদিক, বৈদ্যুতিক গণমাধ্যমের ক্যামেরা নিয়ে কাটিয়ে গেলেন। পরে আকাশ পথে বুলবুল আক্রান্ত এলাকা ‘দর্শন’ করলেন।

আর কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের মতন মানুষ, যিনি গত দুটি নির্বাচনে রায়দিঘি থেকে পরাজিত হয়েছেন, তিনি সব কিছুকে উপেক্ষা করে, নিজের জীবনকে বিপন্ন করে, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেলেন সেখানকার মানুষদের প্রাণ বাঁচাতে। তাঁদের সম্পত্তি বাঁচাতে। কোথায় গেলেন রায়দিঘির বিধায়ক অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়? টোটো বিলির নাম করে দেবশ্রীর বিরুদ্ধে ৮০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে।

এই অভিযোগ ওঠার পর থেকে কার্যত দেবশ্রী রায়কে সেভাবে প্রকাশ্যে দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্নীতির অভিযোগ– তা নিয়ে আইন-আদালত-থানা ভাববেন। সাধারণ মানুষ বিচার করবেন তাঁদের জনপ্রতিনিধির আগামী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। কিন্তু তা বলে যে মানুষজন দেবশ্রীকে ভোট দিয়ে বিধানসভায় পাঠিয়েছেন, দু’দুবার বিধায়ক করেছেন, ‘বুলবুল’ নামক এই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্পর্কে জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্তরের বারবার সাবধানতা বিষয়ক ঘোষণার পরও কেন রায়দিঘির বিধায়ক দেবশ্রী রায় একটিবারও নিজের নির্বাচন কেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন না?

দেবশ্রী রায়ের এই ‘বুলবুল’ আক্রান্ত মানুষদের পাশে না দাঁড়ানোর মানসিকতা আর মহম্মদ সেলিমের রায়গঞ্জের অন্যান্য মানুষদের পাশে দাঁড়ানো বা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের আয়লা বিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভেতরে একটি রাজনৈতিক মানসিকতার, রুচিবোধের, শিক্ষার, বিস্তর ফারাকের দিকটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার করে আমাদের সামনে বুঝিয়ে দিল।

দেবশ্রী রায় বা তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থরা যে রাজনৈতিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছেন, সেই রাজনৈতিক বোধে, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা ছাড়া সাধারণ মানুষের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ, এমনকি তাঁর দলের স্বার্থ ও বিন্দুমাত্র স্থান পায় না। দেবশ্রী রায়ের মতো হঠাৎ করে রাজনীতিক হয়ে ওঠা লোকেদের কাছে দল মানে হল, তাঁকে আইনসভায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি মাধ্যম মাত্র।

সেই দলের প্রতিও বা সেই দলের কর্মীদের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়িত্ববোধ এঁদের ভিতর সঞ্চারিত করতে কখনও কোনও রকম চেষ্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেননি। দেবশ্রী রায়ের মতো লোকেদের ফিল্মি কারিশমাকে ব্যবহার করে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করবার নগ্ন স্বার্থে। আর দেবশ্রী রায়েরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যবহার করেছেন, ছলে-বলে-কৌশলে নিজেদের বিত্ত-বৈভবকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলতে।

তাই বুলবুলের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখেও, নিজের ভোটারদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেবশ্রী রায় বা তাঁর মত লোকেরা আদৌ অনুভব করেন না। অপরপক্ষে মহম্মদ সেলিম বা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যে রাজনৈতিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক জীবনকে বিকশিত করেছেন, সেখানে সমাজ বদলের স্বপ্নে, প্রথম এবং প্রধান স্থান অধিকার করে আছে সাধারণ মানুষ।

সাধারণ মানুষের দুঃখ, যন্ত্রণা, লাঞ্ছনা, কষ্ট– এগুলোকে বাদ দিয়ে সেলিম বা কান্তিবাবুর মতো মানুষজন কখনও তাঁদের রাজনীতির গতি প্রকৃতির অভিমুখ সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ভাবনা ভাবতে পারেন না। মানুষই শেষ কথা– জ্যোতি বসুর এই আপ্তবাক্য কার্যত জীবনের ধ্যান-জ্ঞান বলে মনে করেন বলেই, মহম্মদ সেলিম বা কান্তিবাবুর মতো মানুষেরা মিটিং-মিছিল-লড়াই-আইনসভার ভেতরে-বাইরে, এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেন সাধারণ মানুষের দুঃখ যন্ত্রণাকে।

তাই আইন সভার ভেতরে বামপন্থীদের কতটুকু শক্তি আছে তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে, সাধারণ মানুষের দুঃখ যন্ত্রণাকে লাঘব করার স্বার্থে, সাধারণ মানুষের কাছে এনআরসির ভয়াবহতা তুলে ধরে, দেশব্যাপী যে বিভাজনের চক্রান্ত চলছে– সেই চক্রান্ত সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে অবহিত করবার লক্ষ্যে বাংলার প্রতিটি কোনায় কোনায় ছুটে বেড়াচ্ছেন সেলিম।

বুলবুলের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যে রায়দিঘির মানুষরা তাঁকে দু’দুবার ফিরিয়ে দিয়েছেন, এই অভিমানে মুখ বুজে বসে না থেকে, শারীরিক সমস্যা বয়স-সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে, বিধায়ক দেবশ্রী রায় কি করলেন, কি করলেন না, রাজ্য সরকার কি করলেন, কি করলেন না– সেইসব কথা চিন্তা না করে, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর স্বার্থে, গরীব মানুষের যেটুকু সহায়-সম্বল আছে, সেগুলিকে রক্ষার স্বার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েন কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মানুষ।

এখানেই তৃণমূল কংগ্রেসের দায়বদ্ধতাহীন রাজনীতি বনাম বামপন্থীদের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ রাজনীতির ভিতর সবথেকে বড় মৌলিক ফারাক। সংসদীয় রাজনীতির নিরিখে যদি আগামী দিনেও বামপন্থীরা সেভাবে সাফল্য অর্জন করতে নাও পারেন, তবুও সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বামপন্থীরা যে এক মুহূর্তের জন্য সরে আসবেন না– একথা কিন্তু খুব জোরের সঙ্গে খুব প্রত্যয় সঙ্গেই বলতে পারা যায়।