সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি গানের রিহার্সাল করতেন মাঝ রাতে কবরস্থানে। অনেকেই ভাবত ছেলেটা নেশাগ্রস্ত তাই এমন পাগলামি করে। মাথায় বিশাল জটা, চোখ বন্ধ করে যুবক গেয়ে চলেছে ‘গাঞ্জা গাঞ্জা, ইটস গাঞ্জা গন……’। লোকে বলছে নেশাখোর , খেয়াল নেই তাঁর। তিনি বব মার্লে, বিখ্যাত জামাইকান রকস্টার, যিনি সব সময় লড়াইয়ের কথা বলেছেন গানের মাধ্যমে। শুধু তাঁর গানের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো বুঝতে চায়নি।

মার্লের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জ্যামাইকার সেইন্ট অ্যান প্রদেশের পাহাড়ঘেরা দরিদ্র অধ্যুষিত গ্রাম নাইন মাইলে। অবহেলিত জামাইকার অবহেলিত মানুষের অধিকার নিয়ে গান গাওয়ায় অনেকের প্রিয় মানুষে পরিণত হন মার্লে। গানে নানা ক্ষোভ ও সংকটের কথা বলে মন জয় করেন তরুণদের। স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠীদের নিয়েই বব তৈরি করেছিলেন ব্যান্ড। দলের নাম ছিল ‘দ্য ওয়েইলার্স ব্যান্ড’। পরবর্তীতে যা সারা বিশ্ব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দলের সদস্য ছিলেন বব মার্লে, পিটার টশ ও বানি ওয়েইলারসহ আরও কয়েকজন। গানের ব্যাপারে তারা এতটাই সিরিয়াস ছিলেন যে মঞ্চভীতি কাটানোর জন্য তারা রিহার্সাল করতেন কবরস্থানে৷

 

 

নেস্তা রবার্ট মার্লে , এটাই মার্লের আসল নাম। মেহনতি মানুষকে নিয়ে গান লেখা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা এই মানুষটার কথা কেউ মনে রাখেনি বললেই চলে। তবু তিনি গান গেয়েছেন। বলেছেন সাম্যের কথা। গানে নানা ক্ষোভ ও সমস্যার কথা বলে মন জয় করেছিলেন তরুণদের। মার্লে ও তার ব্যান্ড ‘ওয়েইলার্স’ ১৯৭৪ সালে ‘বার্নিন’ নামে যে অ্যালবামটি নিয়ে আসে তাতেই ছিল বিখ্যাত গান ‘গেট আপ অ্যান্ড স্ট্যান্ড আপ’। ষাট ও সত্তরের দশকে দেশে দেশে উত্তাল জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে বিদ্রোহী মানুষের বুকে সাহস জুগিয়েছিল ওই গান। তিনি সবাইকে বলতেন একত্র হতে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকতে।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কৃষ্ণাঙ্গদের উপর চলতে থাকা বর্ণবিদ্বেষী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তাঁর গানের ভাষা। রাজনৈতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদও করেছেন মার্লে , মাধ্যম সেই গান এবং গিটার। অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষ নিয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতেন তাঁর গানের মাধ্যমেই।

১৯৬০ সালের মাঝামাঝি থেকেই ওয়েইলার্সের অ্যালবাম বেরোতে থাকে। ‘ ক্যাচ আ ফায়ার ’ ও ‘বার্নিং’ শিরোনামের জোড়া অ্যালবাম প্রকাশের পরই তিনি সারা বিশ্বে পরিচিতি পান। এরপর ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অনেক কনসার্টে গান গেয়েছেন তিনি ও তাঁর দল। সাদা চামড়ার সমাজে দাপটের সঙ্গে আসন গেড়েছিলেন বব মার্লে। জ্যামাইকান রেগে, স্পা ইত্যাদি লোকছন্দের ধারার গান দিয়ে তিনি বিশ্ব জয় করেন।

প্রায় ৫০০ গান লিখে সুর করেছেন। ১৯৮১ সালের ১১ মে আজকের দিনে এই প্রতিবাদী শিল্পীর মৃত্যু হয়। বর্ণবাদ বিরোধী প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি বব মার্লের মৃত্যু হয় ফুসফুস ও মস্তিষ্কের ক্যান্সারে। ‘দ্য ওয়েইলার্স’ অ্যালবামকে ‘বিশ শতকের সেরা অ্যালবাম’ নির্বাচিত করেছিল টাইম ম্যাগাজিন। তার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘গেট আপ স্ট্যান্ড আপ’, ‘বাফেলো সোলজার’, ‘ওয়ান লাভ’ ও ‘নো ওম্যান নো ক্রাই’। বিবিসি তার ‘ওয়ান লাভ’ গানটিকে শতাব্দীর সেরা গান নির্বাচিত করেছিল।