তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: চোখের দৃষ্টিশক্তি জনিত প্রতিবন্ধকতা কর্মজীবনে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না৷ তা প্রমাণ করে দিল বছর সত্তরের বংশীবদন রুইদাস। বাঁকুড়ার ওন্দার ঠাকুরবাড়ি এলাকার এই বৃদ্ধ বছরের পর বছর নিজের হাতে তৈরি করে চলেছেন একের পর শ্রীখোল, ডুগি-তবলার মতো বাদ্য যন্ত্র। চোখের দৃষ্টি দিয়ে নয়৷ মনের দৃষ্টি আর কানে শুনেই বাড়ির সামনে ছোট্ট ফাঁকা জায়গাতে বসেই দু’হাতের জাদুতে একের পর বাদ্য যন্ত্র তৈরি করে সুর তুলে চলেছেন। আর এই দৃষ্টি শক্তিহীন বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরের কাজের প্রশংসা করেছেন বহু স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পীও।

দাদু, বাবার হাত ধরেই সেই কোন ছোটো বেলায় এই পেশায় যোগ দিয়েছেন বংশীবদন রুইদাস। ছোটবেলায় দৃষ্টিশক্তি আর পাঁচ জনের মতো স্বাভাবিক ছিল৷ কিন্তু ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ পেলে হয়তো এই অবস্থা হতোনা। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য আর সঠিক চিকিৎসার অভাবে বছর তিরিশ আগেই দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নিভে গেল এই শিল্পীর। কিন্তু পেট বড় বালাই। পেটের টানে আর নিজের মানসিক জোরে স্বমহিমায় সেই দিনের যুবক বংশীবদন। ফের হাতে তুলে নিলেন বাদ্যযন্ত্র তৈরির সরঞ্জাম। তারপর আর থামা নেই। এভাবেই চলতে থাকে একের পর বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজ। কিন্তু এই বয়সে এসে আক্ষেপ একটাই। হাজারো আবেদন নিবেদনের সত্ত্বেও এই সত্তর বছরে এসে না পেলেন কোন সরকারি সাহায্য৷ তা সে প্রতিবন্ধী ভাতা হোক বা বার্ধক্য ভাতা।

কলকাতা ২৪x৭-এর প্রতিনিধির কাছে তিনি অকপট স্বীকারোক্তি দেন৷ রাজ্য সরকারের তরফে যখন বিভিন্ন শিল্পী ভাতা চালু হয়েছে৷ তখন কোনও অজ্ঞাত কারণে এই সব থেকে ব্রাত্যই থেকে যান চোখে দেখতে না পাওয়া বংশীবদন রুইদাস। শ্রী খোলে কালো গাব লাগাতে লাগাতে বলেন, সেই বয়স আর নেই, চোখের দৃষ্টি তো সেই কবেই গেছে। পেটের টানে এই কাজ করে যেতে হয়। যে কাজটা করতে এক ঘণ্টা লাগার কথা৷ তা করতে এখন দু’-তিন ঘণ্টা লেগে যায়। তাঁর এই কাজে খুশি পাড়া প্রতিবেশীরাও। তিনি যে এখন অনেক মানুষের প্রেরণা স্বরূপ।

প্রতিবেশী বিশ্বনাথ বাউরী বলেন, ‘আমাদের ছোটো বেলা থেকেই ওনাকে এভাবেই দেখে আসছি। আমরা পাড়ার লোকেরা উনি যাতে সরকারি ভাতা পান তার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তা আজও সম্ভব হয়নি। চোখে দেখতে না পেলেও তার কাজের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে জেলার বাইরেও। সুদূর আরামবাগ, হুগলি থেকেও বংশীবদন রুইদাসের কাছে সঙ্গীত প্রিয় মানুষ বাদ্যযন্ত্র তৈরি করাতে আসেন বলে তিনি জানান।’

বংশীবদন রুইদাসের বৌমা পরী রুইদাস বলেন, ‘আমাদের কোনও জমি-জমা নেই। নিজেরা না চাইলেও উনি টানাটানির সংসারের কথা ভেবে আজও কাজ করে যান। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দরবার করা হলেও কোন ধরণের সাহায্য পাওয়া যায়নি বলে পরী রুইদাসও দাবি করেন।’

এই বিষয়ে আমরা কথা বলেছিলাম ওন্দা পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি শ্যামল মুখ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি আমাদের প্রতিনিধিকে কথা দিয়েছেন খুব শীঘ্রই যাতে এই অবহেলিত শিল্পী ভাতা পান তার ব্যবস্থা তিনি করবেন। এখন দেখার কবে সরকারি সাহায্য পান এই অন্ধ বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগর বৃদ্ধ বংশীবদন রুইদাস। ওন্দার ঠাকুরবাড়ি গ্রামের মানুষের সঙ্গে আমরাও এখন সেই দিকেই তাকিয়ে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ