Mamata Banerjee & CBI

সুমন ভট্টাচার্যঃ ১৯৭৭ এর ২১শে মার্চকে ভারতবর্ষ মনে রেখেছে জরুরি অবস্থার অবসানের জন্য। আর ২০২১ এর ১৭ই মে কে আমরা, ভারতবাসী মনে রাখব নয়া জরুরি অবস্থা বা ফ্যাসিবাদের নির্লজ্জ আক্রমণের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিরোধের জন্য। নারদা কান্ডে ধৃত চার নেতা, তৃণমূলের দুই মন্ত্রী, এক বিধায়ক এবং বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা শোভন চট্টোপাধ্যায় তো শুধু বিকেলে জামিন পেলেন না, আসলে আসমুদ্র হিমাচল আরও একবার জানলো ভারতবর্ষের বিচার ব্যবস্থায় যে কোনও ধরনের স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিরোধ করে দিতে পারে।

সোমবারের নাটকীয় গ্রেফতার এবং তারপরে বিকেলে জামিন, নি:সন্দেহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেল যে তিনি যে ভবিষ্যতে মোদী-শাহের এই অদ্ভুত যুগলবন্দীকে বা খামখেয়ালি স্বৈরশাসনকে প্রতিহত করতে পারেন, সেটা আর একবার তৃণমূল সুপ্রিমো প্রমাণ করে দিলেন। একই সঙ্গে তিনি দলীয় সতীর্থদের পাশে দাঁড়াতে কলকাতার নিজাম প্যালেসে সিবিআই অফিসে গিয়ে টানা ছ’ঘন্টা ধর্নায় বসে থেকেছেন, আবার আদালতের রায়ের উপর তাঁর আস্থা রয়েছে এটা জানিয়ে শান্তভাবে নবান্নে নিজের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে চলে গিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যতটা চিনি, তাতে অনুমান করে নিতে পারি সিবিআই এর দফতর ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি হয়তো সুত্র মারফত জানতে পেরেছিলেন, বিচারপতি জামিনের আর্জি মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু সেটা তো শুধুই অনুমান। কিভাবে নিজের রাজনৈতিক গুরু বৃদ্ধ সুব্রত মুখোপাধ্যায়ই হন, কিংবা তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়ে গেরুয়া শিবিরের স্মরণ নেওয়া শোভন চট্টোপাধ্যায়ের তিনি পাশে দাঁড়ালেন, তা গোটা বাংলা তো দেখলোই, গোটা ভারতবর্ষও সাক্ষী থাকলো।

এই জন্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত আলোচিত এবং মানুষের নেত্রী হিসাবে ক্রমশ ‘আইকন’ হয়ে উঠছেন। একদিকে যেমন তিনি ‘স্ট্রিট ফাইটার’, অন্যদিকে তিনিই আবার কখন প্রশাসকের জুতোয় পা গলিয়ে ফেলতে হয, সেটা জানেন।

সোমবারের সারাদিনের নাটকের এবং রাজনৈতিক চাপানউতোরের নির্যাস তাহলে কি? প্রথমত কেন্দ্রের শাসক দল হিসাবে বিজেপির আরও মুখ পুড়ল এবং বিরোধীরা বলার সুযোগ পেয়ে গেল যে আসলে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ শুধুই প্রতিহিংসার রাজনীতি বোঝেন। তা না হলে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে দুরমুশ হওয়ার একপক্ষ কালের মধ্যে তৃণমূলের তিনজন বিধায়ককে গ্রেফতারের মতো হারাকিরি কেন বিজেপির নেতৃত্বধীন কেন্দ্রীয় সরকার করবে? দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি যে সত্যি সত্যি বিজেপির লেজুর ‘দালাল’–এ পরিণত হয়েছে, তার প্রমাণ একই মামলায় অভিযুক্ত শুভেন্দু অধিকারী, মুকুল রায় বা শঙ্কুদেব পান্ডাকে কেন সিবিআই ছেড়ে দিল? আশ্চর্যের কথা নারদার কর্ণধার ম্যাথু স্যামুয়েল, যাঁর স্টিং অপারেশনের ভিত্তিতে এই দূর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়, তিনি অবধি সুদূর কেরালা থেকে বসে সোমবার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে কেন একই মামলায় অভিযুক্ত শুভেন্দু অধিকারীকে গ্রেফতার করা হল না?

আদালতে সিবিআই চার্জশিট পেশ করে দেওয়ার পরও কেন অভিযুক্তদের গ্রেফতার করার দরকার হল বা এই চারজন কোন্ তথ্যপ্রমাণকে নষ্ট করে দিতে পারেন, সেগুলি সবই আইনি সওয়াল জবাবের বিষয় ছিল। কারণ, বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা সকলেই বলছিলেন, নারদা মামলায় একমাত্র সাক্ষী ম্যাথু স্যামুয়েল, আর যাবতীয় তথ্য প্রমাণ সেন্ট্রাল ফরেন্সিক ল্যাবরেটারির কাছেই আছে। তাহলে সিবিআই এর যেটা যুক্তি ছিল, এই চারজনকে গ্রেফতার করে জেরা করতে হবে এবং তাঁদের হেফাজতে রাখাটা জরুরি, কারণ তা না হলে তথ্য প্রমাণ নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে, তার কোনটাই আদালতে টেকেনি। কারণ নারদা মামলার প্রায় ৫ বছর বাদে সিবিআই এর এই গ্রেফতারি যে একমাত্র, একমাত্র কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, তা ঘটনা পরম্পরাই প্রমাণ করে দিয়েছে। সেই জন্যই সিবিআই এর বিশেষ বিচারপতি চার অভিযুক্তকে জামিনও দিয়ে দিয়েছেন।

গোটা ভারতবর্ষের বিভিন্ন চ্যানেলের জন্য আলোচনায় অংশ নিতে নিতে বুঝতে পারছিলাম তামিলনাডু থেকে অমৃতসর, ছত্রিশগড় থেকে কেরালা, কিভাবে বাংলার এই নাটকীয় ঘটনাক্রমের দিকে নজর রেখেছে। নজরে রাখার আরও একটা কারণ, গোটা দেশ এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ-এ বেসামাল। ভারতবর্ষ তো মনে রাখবে যখন ভ্যাকসিনের অভাব ছিল, অক্সিজেনের সংকটে মানুষ মারা যাচ্ছিল, ঠিক তখনই অমিত শাহের অঙ্গুলিহেলনে সিবিআই পশ্চিমবঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতির এই চিত্রনাট্য লিখেছিল। একইসঙ্গে হয়তো ভারতবর্ষ এটাও মনে রাখবে সোমবার যখন গুজরাটের নেতা অমিত শাহ এই সব কান্ড ঘটাচ্ছিলেন, তখনই গুজরাটে ভয়াবহ ঘুর্নিঝড় ধেয়ে আসছিল।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.