সুমন বটব্যাল, কলকাতা: এক, দু’ লাখ নয় পুরুলিয়ার শিমুলিয়ায় বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের জনসভার জন্য খরচ করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা! শুধু মাত্র প্যান্ডেল তৈরির জন্যই খরচ করা হয়েছে প্রায় ৮৫ লক্ষ টাকা৷ এমনটাই দাবি শাসকদলের৷

রাজ্যের মন্ত্রী তথা পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের সভাপতি শান্তিরাম মাহাতো বলেন, ‘‘খোঁজ নিয়ে দেখুন, অমিত শাহর সভায় প্রায় কোটি টাকা খরচ করেছে বিজেপি৷’’ একই সঙ্গে তাঁর জোরালো অভিযোগ, ‘‘টাকার বিনিময়ে ঝাড়খন্ডের বোকারো, এরাজ্যের আসানসোল ও দুর্গাপুর থেকে গাড়িতে করে লোক এনে মাঠ ভরিয়েছিল বিজেপি৷’’

বিজেপির এরাজ্যের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘অমিত শাহের জনসভার মঞ্চের জন্য সবমিলিয়ে মাত্র ৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে৷ আসলে জঙ্গলমহলে আমাদের জনসভায় লাখো মানুষের উপস্থিতি দেখে শাসকদল ভয় পেয়ে গিয়েছে৷ তাই ওরা মিথ্যে কুৎসা করছে৷’’ একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘আমরা নয়, শাসকদলই টাকা ছড়িয়ে, সন্ত্রাস করে পঞ্চায়েত ভোট করিয়েছে৷’’

গত বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার শিমুলিয়ায় ঝাড়খন্ড সীমান্তে জনসভা করেন অমিত শাহ৷ বিজেপি নেতৃত্বর দাবি, জনসভায় লাখো মানুষ হাজির হয়েছিলেন৷ সূত্রের খবর, দলের সর্বভারতীয় সভাপতির জনসভার মঞ্চের ভার দেওয়া হয়েছিল ঝাড়খন্ডের রাঁচির একটি নামী ডেকোরেটার সংস্থাকে৷ সম্পূর্ণ লোহার কাঠামোয় অত্যাধুনিক প্যান্ডেলটি তৈরি করা হয়েছিল৷

মঞ্চে দামী বসার চেয়ারের পাশাপাশি কর্মীরা যাতে দূর থেকে স্পষ্টভাবে মঞ্চের নেতাদের দেখতে পান ও তাঁদের ভাষণ পরিষ্কারভাবে শুনতে পান সেজন্য সভাস্থলের চারিদিকে লাগানো হয়েছিল একাধিক এলইডি টিভি৷ এছাড়া জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মীদের সভাস্থলে আনতে ভাড়া করা হয়েছিল একাধিক বাস৷ রোদ্দুরে যাতে কর্মীদের কষ্ট না হয়,সেজন্য সমগ্র শিমুলিয়া ময়দান মুড়ে ফেলা হয়েছিল দামী ত্রিপলে৷

প্রকাশ্যে বিজেপি নেতারা সভার জন্য কোটি টাকা খরচের কথা মানতে না চাইলেও দলের একটি সূত্রের খবর, কোটি না হোক, সভার মঞ্চ তৈরি থেকে কর্মীদের বাসে করা আনা- সব মিলিয়ে ৫০ লাখের বেশি টাকা খরচ হয়েছে৷ প্রসঙ্গত, ভিড়ে ঠাসা ওই সমাবেশ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হুঁশিয়ারি দিয়ে অমিত শাহ বলছিলেন, ‘‘বাংলার মানুষ জেগে উঠেছে৷ তৃণমূল আর বেশি দিন রাজ্যের ক্ষমতায় থাকতে পারবে না৷ ২০২১ সাল বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপি৷’’

জবাবে এদিন কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী তথা তৃণমূলের পুরুলিয়ার জেলা সভাপতি শান্তিরাম মাহাতো৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা উত্তরপ্রদেশ বা মধ্যপ্রদেশ নয়, এটা পশ্চিমবঙ্গ৷ টাকার বিনিময়ে বাংলাকে বিজেপি কিনতে পারবে না৷ বাংলার মানুষ ওদের চরিত্র বুঝে গিয়েছে৷ আগামী লোকসভা নির্বাচনে দেখবেন এরাজ্য থেকে বিজেপি মুছে গিয়েছে৷’’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুকুলহীন তৃণমূলে এরাজ্যে গেরুয়া ঝড় ক্রমেই তীব্রতর হয়েছে৷ সাম্প্রতিক প্রতিটি উপ নির্বাচনেই নজিরবিহীনভাবে নিজেদের ভোট ব্যাংক বাড়াতে সক্ষম হয়েছে গেরুয়া শিবির৷ ভোটের ফলাফলের নিরিখে এই মুহূর্তে গেরুয়া শিবিরই রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে৷ এমনকি সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনে জঙ্গলমহলে নজিরবিহীন ফলাফল করেছে গেরুয়া শিবির৷ এই পরিস্থিতিতে একাধিক সভা সমাবেশ থেকে শাসকদলের নেতারা বিজেপির বিরুদ্ধে টাকা ছড়ানোর অভিযোগে সরব হয়েছেন৷

স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অভিযোগের সুরে বলেছিলেন, ‘‘ওরা টাকা ছড়িয়ে বাংলা দখলের চেষ্টা করছে৷’’ যদিও বিজেপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর পাল্টা হুঁশিয়ারি, ‘‘পায়ের তলার মাটি ক্রমেই সরে যাচ্ছে, সেটা টের পেয়েই আমাদের নামে টাকা ছড়ানোর মিথ্যে কুৎসা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷’’ আপাতত বিজেপির কোটি টাকার সমাবেশকেই প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে মরিয়া শাসক৷ তবে তাতে আখেরে রাজ্যে গেরুয়া ঝড় রোখা সম্ভব হবে কি না, সময়েই মিলবে তার সদুত্তর৷