দেবময় ঘোষ: ছিল ২৩ হল ৩০৷ লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় ২৩টি আসনের দাবি নিয়ে লড়াই করতে নেমেছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ৷ কলকাতা থেকে জেলা শহর – রাজ্যের বিভিন্ন জনসভায় ২৩ সংখ্যাটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে বিজেপি নেতাদের কন্ঠে৷ শুধু অমিত শাহই বা কেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও রাজ্যে জনসভাগুলিতে কয়েকবার ২৩টি ‘কমল’ চেয়েছেন ভোটারদের থেকে৷ দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের দুই রাত আগে রাজ্যে নিজেদের দাবি বাড়াল বিজেপি৷ একলাফে ২৩টি আসন থেকে সাতটি বাড়িয়ে বিজেপির দাবি এখন ৩০৷

বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয় দলের সর্বভারতীয় সভাপতির ‘ডিমান্ড’কে বাড়িয়েছেন৷ কৈলাসের বক্তব্য, ‘‘২৩টি আসনের কথা আমরা বলেছিলাম ঠিকই৷ কিন্তু জনতার সারা এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনতার অন্তর্নিহিত আক্রোশ দেখে বলছি, আরও ৭টি আসন বেশি হলেও অবাক হব না৷’’ শুধু ২৩ থেকে ৩০টি আসনই নয় – তৃণমূল সরকারের ‘ব্যাক কালকুলেশন’ও শুরু হয়ে গিয়েছে বলে মনে করেন কৈলাস – ‘‘জনতা বলছে এই তৃণমূল আর না৷ তৃণমূলে অনেক নেতাই লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপিতে যোগদান করতেব৷ নির্বাচনের পর রাজ্যের শাসকদলের অস্তত্ব সংকট শুরু হবে৷ তারপর আর সরকার কতদিন … তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ৬ মাসও টিকবে না৷’’

রাজনৈতিক মহল বিজেপির সংখ্যাতত্ত্বের ব্যাখ্যা খুঁজছে৷ কেন ২৩? কেনই বা হল ৩০? কেন মমতা বব্দ্যোপাধ্যায়ের ঢঙে ‘৪২ সে ৪২’নয়? রাজনৈতিক ঢক্কানিনাদের বাজারে তত্ত্ব, নীতি, আদর্শের তেমন আর কোনও দাম নেই৷ যদিও জনসংযোগের গুরুত্বকে এখনও অস্বীকার করতে পারে না নেতারা৷ সেক্ষেত্রে মমতা বা কৈলাসের মন্তব্যকে ‘পলিটিকাল প্রেসার ট্যাকটিক্স’হিসাবে দেখছে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা৷ রাজ্য বিজেপির এক সিনিয়র নেতা যেমন সাফ বলছেন ৭টা থেকে ৮টা আসন জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি৷ দার্জিলিং, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার আমরা পাবোই৷ বালুরঘাট এবং রায়গঞ্জ পঞ্চাশ-পঞ্চাশ৷ পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, কৃষ্ণনগর, বসিরহাট, বারাকপুর আমরাই জিতবো৷’’

রাজ্য বিজেপির একটা বড় অংশ মনে করছে, বাম-কংগ্রেস আসন সমঝোতা হয়নি৷ তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের এক বিশেষ নেতার বিপক্ষে (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন) অন্তর্নিহিত আক্রোশ তৃণমূল দলটাকে ভেঙে দিয়েছে৷ তৃণমূলের একটি অংশের ভোট বিজেপিতে আসবে৷ পঞ্চায়েতেও এই সুবিধা বিজেপি পেয়েছে৷ বাবুল সুপ্রিয় কেমন ভোট কাটাকাটিতে ২০১৪ সালে আচমাই জিতেছিল, এবারও বিজেপির ঝুলিতে এই রকম আসন আসবে – বরং সংখ্যাটা আরও বাড়বে৷ মোট সংখ্যাটা ১০ এর উপরে যাবে৷

ফাইল ছবি

রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে পাওয়া ২৭ শতাংশ ভোট বেড়ে যদি ৪৫ শতাংশ হয়, একমাত্র তাহলেই পশ্চিমবঙ্গে ২৩টি লোকসভা আসন পেতে পারে বিজেপি৷ রাজনৈতিক মহল এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলায় বাড়তি ১৮ শতাংশ ভোট জোগার করা বিজেপির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে৷ তবে এই ১৮ শতাংশের গণ্ডি টপকে যেতে পারলে তবেই অমিত শাহের ২৩টি লোকসভা আসন জয়ের স্বপ্ন সফল হবে৷ বিজেপির অনেক নেতাই বিশ্বাস করেন, বিজেপি বাংলায় যা ভোট পায় তা হল ‘নেগেটিভ ভোট ৷’

তৃণমূলের জনপ্রিয়তার কমে যাওয়ার কারণে ওই ভোট বিজেপির দিকে ঘুরে গিয়েছে৷ এই কারণেই পার্টি রাজ্যের বিভিন্ন ভোটে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে৷ কিন্তু জেতার জন্য (ভোটে জেতার জন্য বা সরকার গড়ার জন্য) পার্টিকে পজিটিভ ভোট পেতে হবে৷ একমাত্র মাঠে-ময়দানে সাংগঠনিক কাজকর্ম করেই তা সম্ভব৷ লোকসভা নির্বাচনের পরই বিজেপির সংগঠন চিত্রটা পরিষ্কার হবে৷ দিলীপ ঘোষ, মুকুল রায়দের ‘পারফরমেন্স’ বোঝা যাবে৷

২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩ শতাংশ আসনে নির্বাচিত হয়েছিল বিজেপি প্রার্থীরা৷ ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৭ শতাংশ৷ ২৪ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি নবান্নে শাসককে রীতিমতো চিন্তায় ফেলেছে৷ শাসকদল ভাবতে শুরু করেছে, সারা বাংলায় কত ‘বিক্ষুব্ধ তৃণমূল’ রয়েছে? ২৭ শতাংশের মধ্যে বিজেপির আদর্শগত ভোট কতটা? কতটাই বা তৃণমূলের ঘরের ভোট কেটেছে গেরুয়ারা? এই সব প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে শাসকদল জানতে পেরেছে, শুধু বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নয়, আদর্শবিচ্যুত এবং এলাকায় তৃণমূলের ভয়ে ভীত বামপন্থী কর্মীরাও বিজেপিতে নাম লিখিয়েছে৷ মুর্শিদাবাদে বিক্ষুব্ধ অধীনপন্থীরা বা মালদায় যাঁরা কংগ্রেসী পরিবারতন্ত্র এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে সমান মাপের ঘেন্না করেন, তাঁরাই বিজেপিতে যোগ দিয়েছে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই দলকে বার্তা দিতে দেরি করেননি, ‘‘সিপিএমের ভালো লোকেদের দলে টানতে হবে৷ আপনারা (দলের কর্মীরা) যদি না পারেন আমি করে দেখাবো?’’

তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৮০০ জেলা পরিষদ আসন জিতেছে৷ সেক্ষেত্রে যদি ধরেও নেওয়া হয় তৃণমূলের আসন বাড়ছে না, তবুও বিজেপির সঙ্গে প্রায় ১৭.৯১ শতাংশ ভোটের তফাত রয়েছে৷ কিন্তু বিচার্য বিষয় এই যে বিজেপি ২৭ শতাংশ ভোট বাড়িয়ছে পঞ্চায়েতে৷ তৃণমূলের ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট এসেছে রাজ্যের শেষ বিধানসভা নির্বাচনে৷ সেক্ষেত্রে, অলেক বিশেষজ্ঞের মতে তুলনা যুক্তিহীন৷ লোকসভায় রাজ্যে চমক রয়েছে৷