দেবময় ঘোষ, কলকাতা: তিন থেকে বারো৷ বিজেপির চ্যালেঞ্জ, সেই সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে যেখানে পৌঁছবে, তা-ই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ হবে৷ ২০১৬ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে পর বিজেপির তিনজন এমএলএ বা বিধায়ক ছিলেন – উত্তরবঙ্গের মাদারিহাটের বিধায়ক মনোজ টিগ্গা, বৈষ্ণবনগরের বিধায়ক স্বাধীন সরকার এবং খড়গপুর সদরের বিধায়ক দিলীপ ঘোষ৷ তবে শেষ লোকসভা নির্বাচন এবং কিছু উপ নির্বাচনে দল পরিবর্তনের হিড়িকে সংখ্যার কিছু পরিবর্তন হয়েছে৷ অন্যদল থেকে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন ৬ জন বিধায়ক৷

বিধানসভা উপনির্বাচনে চারটি আসন পেয়েছে বিজেপি৷ কিন্তু খড়গপুর সদরের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ৷ কারণ, তিনি বর্তমানে মেদিনীপুরের সাংসদ৷ সব মিলিয়ে, বর্তমানে রাজ্যে বিজেপির বিধায়কের সংখ্যা ১২৷ যদিও যারা অন্য রাজনৈতিক দল ত্যাগ করে বিজেপিতে এসেছেন, তারা সরকারিভাবে বিধানসভার খাতায় তাঁদের পুরনো দলের নামেই নথিভুক্ত হয়ে রয়েছেন৷

পড়ুন: তাঁকে নিয়ে ভুল স্বীকার মমতার, জবাব দিলেন নোয়াপাড়ার মঞ্জু

লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই কিছু জায়গায় বিধানসভা উপনির্বাচন হয়েছে৷ দার্জিলিং, হবিবপুর, কৃষ্ণগঞ্জ এবং ভাটপাড়ায় উপনির্বাচনে জিতেছে বিজেপি৷ এছাড়া, বাগদার কংগ্রেস বিধায়ক দুলাল বর, মুকুল রায় পুত্র বীজপুরের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক শুভ্রাংশু রায়, বিষ্ণুপুরের কংগ্রেস বিধায়ক তুষারকান্তি ভট্টাচার্য, হেমতাবাদের সিপিএম বিধায়ক দেবেন্দ্র রায়, নোয়াপাড়ার তৃণমূল বিধায়ক সুনীল সিং এবং বনগাঁর বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস – বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন৷ খড়গপুর সদর, কালিয়াগঞ্জ এবং করিমপুরে বিধানসভা উপনির্বাচন হবে৷ লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের শতাংশের হিসাবে খড়গপুর সদর, কালিয়াগঞ্জে এগিয়ে আছে বিজেপি৷ আবার করিমপুর বিধানসভায় এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস৷

বিজেপি নেতা মুকুল রায় এবং রাজ্য বিজেপির পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় দাবি করেছেন, সাত দফা যোগদান পর্ব চলবে৷ প্রথম দফার তৃতীয় ধাপ শেষ হয়েছে৷ শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে না৷ মুকুলের মতে, ১২২টি পুরসভা এবং ৬টি পৌরনিগমের মধ্যে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ১০১টি পুরসভাতে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি৷ ৪টি পৌরনিগমেও এগিয়ে রয়েছে বিজেপি৷ ওই পুরসভা এবং পৌরনিগমগুলির কাউন্সিলররা দল এবং রং পরিবর্তন করতে তৈরি হয়ে রয়েছেন৷

অন্য আরেকটি পরিসংখ্যান দিয়ে মুকুল রায় বলেছেন, লোকসভা নির্বাচনের ফলের ভিত্তেতে ১২১টি বিধানসভায় এগিয়ে রয়েছে বিজেপি৷ সেই সব জায়গার বর্তমান বিধায়করা সময়মতো বিজেপি’র জার্সি পরতে তৈরি৷ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ৩০টি বিধানসভা কেন্দ্রে মাত্র ১ থেকে ৩ হাজার ভোটের নিরিখে হেরেছে বিজেপি৷ মানুষের জনমত খুব দ্রুত বদলাচ্ছে৷ বিধানসভা নির্বাচনের আগেই ওই বিধানসভাগুলিতে ‘লিড’ নিতে পারবে বিজেপি৷

দশ বছরে ৩৪ শতাংশ:-

রাজ্যে নির্বাচনগুলির ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ – এই দশ বছরে রাজ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ ভোট বাড়িয়েছে বিজেপি৷ শেষ লোকসভা নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে পাওয়া ২৭ শতাংশ ভোট বেড়ে যদি ৪৫ শতাংশ হয়, একমাত্র তাহলেই পশ্চিমবঙ্গে ২২টি লোকসভা আসন পেতে পারে বিজেপি৷ রাজনৈতিক মহল এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতামত ছিল, বাংলায় বাড়তি ১৮ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে৷ কিন্তু দিলীপ ঘোষরা সেই হিসেব সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছেন৷ ৪০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে ১৮টি লোকসভা আসন দখল করেছে বিজেপি৷ মালদহ দক্ষিণ এবং আরামবাগে খুব কম ব্যবধানে হেরেছে বিজেপি প্রার্থীরা৷

মুকুল ‘ফ্যাক্টর’:-

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পঞ্চায়েত নির্বাচনে একদল তৃণমূলকেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখা গিয়েছে৷ তবে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মী-সমর্থকরা বিজেপি নেতাদের হাত ধরে (বিশেষত মুকুল রায়) দলে-দলে গেরুয়া শিবিরে নাম লিখিয়েছে ৷ পঞ্চায়েতের মনোনয়ন জমা, প্রত্যাহার থেকে শুরু করে ভোটপর্ব এবং গণনা – এক বেনজির সন্ত্রাসের মুখ দেখেছে বাংলা৷

অনেকেই মন্তব্য করেছেন – বাংলায় এই রকম রক্তাক্ত নির্বাচন শেষ কবে হয়েছে তা মনে করা যায় না৷ তবে পঞ্চায়েতে গ্রাম বাংলায় বিজেপির অভাবনীয় সাফল্যে শাসকের চোখ কপালে উঠেছে৷ ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩ শতাংশ আসনে নির্বাচিত হয়েছিল বিজেপি প্রার্থীরা৷ ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৭ শতাংশ৷ ২৪ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি তৃণমূলকে রীতিমতো চিন্তায় ফেলেছিল৷ শাসকদল ভাবতে শুরু করেছে, সারা বাংলায় কত ‘বিক্ষুব্ধ তৃণমূল’ রয়েছে? ২৭ শতাংশের মধ্যে বিজেপির আদর্শগত ভোট কতটা? কতটাই বা তৃণমূলের ঘরের ভোট কেটেছে গেরুয়া শিবির? মুকুল রায় নিজেই দাবি করেছেন, তৃণমূলের বন্ধুরা দলের ভিতরে থেকে তাঁকে সাহায্য করেছেন৷

ভোটের হিসাব:-

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৬.১৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে৷

২০১১ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছে ১০.০২ শতাংশ ভোট৷

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২টি আসন পায়৷ দার্জিলিং এবং আসানসোলে জয়ী হয় বিজেপি৷ ভোট পায় ১৭.০২ শতাংশ৷

২০১৬ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ১২.২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি৷

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট ৪০ শতাংশেরও বেশি৷

২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল৷ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ৪৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে৷ তবে ১২টি আসন কমে গিয়েছে তৃণমূলের৷