সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , কলকাতা : ধর্ম এই মুহূর্তে রাজনীতির বড় অঙ্গ। এতদিন রামায়ণ ছিল এই ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বড় হাতিয়ার। সেই তালিকায় মহাভারতও এসেছে কিন্তু রামায়ণের মতো জায়গা করে নিতে পারেনি। এবার পুরো মহাকাব্যকেই লজ্জাকর সোশ্যাল মিডিয়ায় সস্তার রাজনীতির মাধ্যমে কাদা ছোড়াছুঁড়ির অঙ্গ করে তোলার জায়গায় নিয়ে চলে এল দুই রাজনৈতিক দলের কিছু অন্ধ সমর্থক।

রাম এবং বাম কেন্দ্রে বা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই দুই দল কোনওভাবেই একে অপরের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। উলটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাঝে মাঝেই বিজেপি এবং বামপন্থার হাতে হাত ধরে পথ চলার অভিযোগ তোলেন। কিন্তু সোশ্যাল রাজনীতির চর্চায় বিজেপি এবং বামপন্থী সমর্থকদের একটা বড় অংশ লড়ছে একে অপরের বিরুদ্ধে। বিষয় অলিখিত নাম হিসাবে বলা যেতে পারে ‘মহাভারত এবং তার শুদ্ধিকরণ’। বাম সমর্থকরা মহাভারতের বিভিন্ন অংশ তুলে দেখানোর চেষ্টা করেছে মহাভারত ভারতবর্ষের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে না। উলটে তা কলুষিত করে। তাদের এই ভাবনাকে পালটা আক্রমণ করে বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া সমর্থকরা অশ্লীল ভাবে কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করেছে।

 

বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পিনাকী চট্টোপাধ্যায় নামে এক যুবক একটি পোস্ট করেন। যুবক প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। পিনাকী সোশ্যাল মিডিয়ার বিতর্কিত পোস্টের সারমর্ম মহাভারত মহাকাব্য ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, বধূ নির্যাতন এই সমস্ত অসামাজিক কাজ করতে শিখিয়েছে। ‘#মহাভারতীয়_রেপ’ শীর্ষক পোস্টে সে লিখেছে, “রেপ কালচার, শ্লীলতাহানি, নারীর অসম্মান মহাভারতীয় মানসিকতার পরতে পরতে। ঋক্‌বেদে দেবরাজ ইন্দ্রের প্রাক বৈদিক দেবীকে শিৎকার মানে রেপ করা বা লক্ষণের সূর্পনখার শ্লীলতাহানি নিয়ে আগেও বলেছি, তাই আজ শুধু মহাভারতীয় লাম্পট্য, বর্তমান শাসক অনুসৃত মতাদর্শে আলোকপাত, রেপ কালচার নিয়ে।

ভারতের এপিক বা “মিথোলজিক্যাল ইতিহাস” এ প্রথম ডোম্যাস্টিক রেপ ও মলেস্টেশন এর রেকর্ড – কার? হাহাহা জানো না? মহাভারত পড়ো। শান্তনু আর সত্যবতীর দুই পোলা। চিত্রাঙ্গদ বড়ো আর বিচিত্রবির্য ছোট। শান্তনু মারা যাবার পর, চিত্রাঙ্গদ রাজা হল। কিন্তু গান্ধর্ব চিত্রাঙ্গদ, রাজা চিত্রাঙ্গদকে কড়া চ্যালেঞ্জ করলো। তিন বছর ধরে দুই চিত্রাঙ্গদ, সরস্বতী নদীর তিরে যুদ্ধ করতে করতে শেষে রাজা চিত্রাঙ্গদ মারা গেলো। চিত্রাঙ্গদ নিঃসন্তান তাই বিচিত্রবির্য হল রাজা। বিচিত্রবির্যর দুই বৌ অম্বিকা আর অম্বালিকা। কিন্তু তাদের ‘লো স্পার্ম কাউন্ট’ হওয়ায় সন্তান হয় না। শেষে বেদব্যাস ঋষি অম্বিকা আর অম্বালিকাকে রাজ অনুগ্রহে ‘ধর্ষণ’ করলো। হ্যাঁ রেপ। অসহায়া অম্বিকা ও ব্যাসদেবের অপ্রেম যৌনমিলনে জন্মাল জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র। অনিচ্ছুক অম্বালিকার দেহ ঋষির ঘর্ষণে পেলবর্ণ হল। অর্থাৎ রক্তশূন্য দেখালো। জন্মালো পাণ্ডু। ও হ্যাঁ, উদ্ধত কামোন্মত্ত ঋষি এরপর এক দাসীকেও রেপ করেছিল, তার কোলেই জন্মান বিদুর। সরকারি মন্ত্রীসভায় সরকারি ভাবে, নারীর বলাৎকারের প্রথম ও দ্বিতীয় ও তৃতীয় উদাহরণ মহাভারতে। অম্বিকা অম্বালিকা ও দাসী।’

ওই যুবকের পোস্টে আরও দাবি , “গান্ধারী প্রথম নারী যিনি ছেলেদেরকে মেয়েদের সম্মান দিতে শেখাননি এবং সূর্পণখার পর দ্রৌপদী দ্বিতীয় নারী যিনি শ্লীলতাহানির শিকার। নারীদের প্রতি মহাভারতীয় শ্রদ্ধার শ্রাদ্ধ।” এই মহাভারতকে ইতিহাস যারা ভাবে তারা খুবই বোকা সেটা বোঝাতে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে তা লেখা হয়েছে। তারপরে লেখা হয়েছে , “তাই ‘বেটি বাঁচাও’ স্লোগানে আপনাকে ওরা কতোটা চ্যালেঞ্জ করছে বুঝুন।”

পালটা অশ্লীল পোস্ট শুরু করেছে অবাম সোশ্যাল ফেসবুক পেজ ‘বাম পতনের শব্দ হয়’। তারা ওই পোস্ট শেয়ার করে লিখেছে , “শুরুটা করেছিল সর্বভারতীয় নেতা সীতারাম ইয়েচুরি। মহাভারত নিয়ে জঘন্য কুৎসা করছে ডিপিতে লেনিন, কভার ফটোয় এসএআই ঝুলিয়ে রাখা কলকাতার কমিউনিস্ট সারমেয়রা। অথচ আমরা সকলেই জানি, এদের এইসব প্রগতির বাণী কোনোদিন কোরান-হাদিস নিয়ে আসবে না। নোংরামি হবে শুধু ভারতীয়দের ঐতিহ্য নিয়েই। নিজে দেখুন। পাড়ায় রামায়ণ মহাভারত পড়া কাকু-কাকিমা জেঠু-জেঠিমাদের দেখান। এখনও সতেরোটা লোকসভার ভোট বাকি। ভারতবিদ্বেষী কমিউনিস্টদের একটিও ভারতীয় ভোট নয়। যাদের টাকা নিয়ে এসব লিখছে, সেই ভোটে জিতে আসতে পারলে, আসুক।

শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার বলেন , “সোশ্যাল মাধ্যমে এসব কুরুচিকর বিষয় নিয়ে যারা বক্তব্য রাখেন তারা নিজেরা অশিক্ষার পরিচয় দেয়। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক আলোচনার কোনও মান নেই। এখনকার রাজনীতি এমনিতেই অত্যন্ত নিম্নমানের তার উপর সোশ্যাল মিডিয়া অতিসক্রিয় হওয়ার ফলে তা আরও নোংরা জায়গায় পৌঁছেছে।”