দেবময় ঘোষ: অল্প তবু অল্প নয়। রাজ্যের শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্ট প্রার্থীরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে যা ভোট পেয়েছে সেদিকেই নজর রয়েছে তৃণমূল-বিজেপির৷ ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে রাজ্যে ৮২৪টি জেলা পরিষদে বামফ্রন্টের হয়ে ফরওয়ার্ড ব্লক একটি মাত্র আসন পেয়েছে৷ সাফল্যের শতকরা হিসাব মাত্র ০.১ শতাংশ৷ পঞ্চায়েত সমিতিতে ৯২১৪ আসনে সিপিএম ১১০টি, সিপিআই ১টি, আরএসপি ৫টি, ফরওয়ার্ড ব্লক ১৩টি আসন পেয়েছে৷

এক্ষেত্রে বামফ্রন্টের আসনসংখ্যা – ১২৮ টি যা মোট আসনের ১.৩৮ শতাংশ৷ গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট ৪৮ হাজার ৬৩৬টি আসনে নির্বাচন হয়েছে৷ ওই কেন্দ্রগুলির মধ্যে সিপিএমের দখলে গিয়েছে ১৪৮৩টি পঞ্চায়েত৷ সিপিআই পেয়েছে ৩৩টি পঞ্চায়েত৷ ফরওয়ার্ড ব্লক পেয়েছে ৯৬টি পঞ্চায়েত৷ আরএসপি পেয়েছে ১০১টি পঞ্চায়েত৷ বামফ্রন্টের দখলে গিয়েছে ১৭১৩টি আসন যা শতকরা হিসেবে ৩.৫২ শতাংশ সাফল্য৷

অর্থাৎ, জেলা পরিষদে ০.১ শতাংশ, পঞ্চায়েত সমিতিতে ১.৩৮ শতাংশ, গ্রাম পঞ্চায়েতে ৩.৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছে বামফ্রন্ট৷ কিন্তু সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে এই ভোট কী বামফ্রন্ট ফেরত পাবে? বামপ্রার্থীরা জোর প্রচার চালাচ্ছে৷ কিন্তু নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা সারা রাজ্যেই লাল পার্টিদের জন্য অশনি সংকেট দেখছেন৷ পঞ্চায়েতে পাওয়া অল্পসংখ্যক বাম ভোটকেই পাখির চোখ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি৷ নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিপিএমের ভোট যেন বিজেপির দিকে না যায়, তা মনে প্রাণে চান তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্ট শতাংশের হিসাবে ত্রিস্তরে যা ভোট পেয়েছে তা তৃণমূলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ ওই ভোটই তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্যে ফের ৩০টিরও বেশি আসনের দিকে নিয়ে যেতে পারে৷ অন্যদিকে বাম ভোটের বেশিরভাগটাই পকেটে পুরতে পারলে বাংলায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর স্বপ্নের কাছাকাছি চলে যাবে – ধারণা বিশেষজ্ঞদের৷

বাংলায় নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, ১৯৮০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বামফ্রন্ট রাজ্যে ৩৮টি আসন পেয়েছে৷ প্রাপ্ত ভোট ৫০ শতাংশ৷ যা এখনও এই বাংলায় রেকর্ড৷ ১৯৯৬ এবং ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ৩৩টি এবং ৩৪টি আসন পেয়েছিল৷ কেন্দ্রে সরকার তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে৷ কিন্তু ২০০৮ সালে প্রকাশিত সাচার কমিটির রিপোর্ট রাজ্যে সংখ্যালঘুদের খারাপ চিত্র তুলে ধরতেই ফ্রন্টের মুসলিম ভোটব্যাংকে ভাঙন শুরু হয়৷ সেই বছরই রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রত্যাশার থেকে খারপ ফল করে বামফ্রন্ট৷ এরপর রাজ্যে শুরু হয় জমী রক্ষার আন্দোলন৷ সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের জেরে বাম শাসনের মূল খুঁটি নড়ে যায়৷ ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট মাত্র ১৫টি ভোট পায়৷ ২০১১ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বাম শাসনের অবসান ঘটে৷ কিন্তু তা বামভোট তৃণমূলের থেকে খুব বেশি কমেনি৷ ২০১৪ সালে সব থেকে খারাপ ফলাফল করে বামফ্রন্ট৷ রায়গঞ্জ এবং মুর্শিদাবাদে জেতে বামপ্রার্থীরা৷ মাত্র ২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বামপ্রার্থীরা৷ ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এবং তার পরের উপনির্বাচনগুলিতে বামভোট ২০ শতাংশের নিচে নেমে যায়৷

যোগেন্দ্র যাদব বা যশবন্ত দেশমুখের মতো নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট জনতার ভোট যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ৷ ওই বামজনতা একটি বড় অংশ নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটকাতে বিজেপির দিকেই ঢলে রয়েছে বলে মনে করছে অনেক বিশেষজ্ঞ৷ সেই কারণেই রাজ্যে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে৷ অন্য মতটি হল, বামফ্রন্টের মোদীবিরোধী অবস্থান থেকে তাদের একটি বড় অংশের ভোট মমতার দিকেই যাবে৷ বামলার রাজনৈতিক ‘পালস্’বোঝার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পারদর্শী৷ দ্বিধাবিভক্ত বামভোটকে টানতে তাঁর বিভিন্ন কার্যকলাপের দিকে নজর রয়েছে বাম ভোটারদের৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে ব্যক্তিগতস্তরে ভালো সম্পর্ক রাখেন মমতা৷ অসুস্থ কমরেডদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সময়ে সময়ে৷

বিশেষজ্ঞদের মতে, মমতার সিপিএম ‘প্রীতির’অন্যতম কারণ কোনও মতেই মানবিক নয়, বরং পুরোপুরি রাজনৈতিক৷ এখনও যাঁরা বামপন্থী, কিন্তু মানেন যে লোকসভায় এরাজ্যে লালপার্টির কোনও সম্ভাবনাই নেই — তাঁদের ভোট পেতে চান মমতা৷ বার্তা স্পষ্ট – বিজেপিকে আটকাতে আমাকে ভোট দিক বামেরা …৷ এরাজ্যে বামপন্থীদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমার — যদিও এই কথা সরাসরি মুখে যা কখনও বলেননি মমতা, তবে বিভিন্ন জনসভায় ঘুরিয়ে আজকাল তাই বলছেন – ‘‘সব সিপিএম খারাপ নয়, সিপিএম নেতাদের দলে টানুন৷’’