তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: প্রাচীন বিষ্ণুপুর ঘরানার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রসারে শুরু হয়েছে তৃতীয় বর্ষের ‘বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’। রাজ্য পর্যটন দফতরের উদ্যোগে বিষ্ণুপুরের ‘পোড়া মাটির হাটে’ শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে ৩ দিনের এই মিউজিক ফেস্টিভ্যাল। বিষ্ণুপুর ঘরানার একাধিক শিল্পী এই উৎসবে সঙ্গীত পরিবেশ করছেন।

শুক্রবার বিশিষ্ট শিল্পী জগন্নাথ দাশগুপ্তের গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। উৎসবের উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরা, রাজ্যের পর্যটন প্রধান সচিব নন্দিনী চক্রবর্ত্তী, মহকুমাশাসক মানস মণ্ডল প্রমুখ। পূর্ব ভারতের একেবারে নিজস্ব শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর ধ্রুপদ। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতপ্রিয় বাঙালির মনে সেই সুর অনেকটাই ধূসর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রাজ্য পর্যটন দফতরের এই উদ্যোগ।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের হাত ধরে তাঁদের দরবারে বিষ্ণুপুর সঙ্গীত ঘরানার সূত্রপাত। সঙ্গীত রসিক রাজা রঘুনাথ সিংহ দিল্লীর বাহাদুর খাঁ সাহেবকে নিয়ে আসেন। তিনিই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছিলেন। পরে গদাধর, রামশঙ্কর ভট্টাচার্য, যদুভট্ট প্রমুখরা এই সঙ্গীত ঘরানাকে নতুন রূপ দেন। শোনা যায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম প্রিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন এই বিষ্ণুপুর ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পী যদুভট্ট।

বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষ্যে অপরূপ আলোক সজ্জায় সেজে উঠেছে জোড় শ্রেণীর মন্দির প্রাঙ্গন। এক দিকে পোড়া মাটির হাট, অন্যদিকে সেখানেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদের মূর্ছণা। সব মিলে মিশে যেন একাকার। অভিনব এই সঙ্গীতের অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকতে ভিড় জমাচ্ছেন বহু পর্যটকও। বিদেশেরও অসংখ্য পর্যটক এই মুহূর্তে রয়েছেন বিষ্ণুপুরে। রাজ্য সরকারের এই অনন্য উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন এলাকাসীও। মল্ল রাজাদের তৈরি অসংখ্য প্রাচীন মন্দিরের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতের টানে আগামিদিনে পর্যটকদের ভিড় এখানে আরও বাড়বে বলে আশাবাদী স্থানীয়রা।

শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যালে বিভিন্ন দিনের আমন্ত্রিত শিল্পী সুরজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, অসিত রায়, সুভাষ কর্মকার, বামাপদ চক্রবর্ত্তী, আব্দুল আজিজ খানেরা। রবিবার সন্ধেয় তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদারের সরোদের মধ্য দিয়ে এবারের বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যাল শেষ হবে।

বর্তমান প্রজন্মকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এই ধরণের অনুষ্ঠানের ভীষন প্রয়োজন বলে করেন শিল্পী প্রবীর কর্মকার। তাঁর কথায়, ‘যাঁরা মনে করেন ধ্রুপদ, খেয়ালের মতো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রেওয়াজ কমে যাচ্ছে তাঁরা ভুল ভাবছেন। এই ধরনের অনুষ্ঠানের ফলে বর্তমান সময়ের সঙ্গীত শিক্ষার্থীরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী যেমন হবেন তেমনি মন্দির নগরী বলে খ্যাত বিষ্ণুপুরের সঙ্গীত ঘরানার প্রতি নতুন করে বহু মানুষ আকৃষ্ট হবেন।’ বিষ্ণুপুরে বেড়াতে যাওয়া এক পর্যটক বকুল রুইদাস বলেন, ‘বিষ্ণুপুর মন্দির নগরী হিসেবে খ্যাত হলেও সঙ্গীতের টানেও এখানে অনেক পর্যটক এখানে আসেন। এখানে এবার বেড়াতে এসে বাড়তি পাওনা হিসেবে মিউজিক ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে।’

বিষ্ণুপুর মিউজিক ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী। তিনি জানান, বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীত আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ঘরানাকে ধরে রাখতে রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিষ্ণুপুরের প্রাচীন মন্দির, শিল্পকলা ও সঙ্গীতের টানে বহু মানুষ এখানে আসেন। পর্যটক টানতে পর্যটন দফতর বিষ্ণুপুরে পরিকাঠামোগত আরও উন্নয়ন করবে বলেও তিনি জানান।