সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি যে শুধু মহিষাসুরমর্দিনীর জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন তা একেবারেই নয়। মানুষ অনেক কারনে মহান হয়। সহজে হওয়া যায় না ‘গ্রেট অগ আল টাইম’। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরাধীন ভারতে তখন নারীর স্থান প্রায় নেই বললেই চলে। যারা ছক ভাংতেন তাঁদের ছাড়া। বাংলার প্রত্যেক ঘরের মহিলাদের ছক ভাঙাবার পথে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।

তাঁর রেডিয়োর অনুষ্ঠান তৎকালীন সমাজে নিয়ে আসতে শুরু করেছিল নবজাগরণ। সেটা অজান্তেই হচ্ছিল। যার জন্য এই অনুষ্ঠান ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। অনুষ্ঠানের সঞ্চালককে রীতিমত মানুষ খুঁজছিল। হাতের কাছে পেলে ঘা কতক ধরে দেয় আর কি। কিন্তু প্রশ্ন উঠবে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে আর না পাওয়ার কি আছে? এখানেই গল্প। যা সত্যি। ১৯২৯ সাল। রেডিয়োর প্রথা ভেঙে একেবারে অন্য রাস্তায় হাঁটছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। মহিলাদের জন্য ‘মহিলা মজলিস’ আরম্ভ করেছিলেন। তিনি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন। শ্রোতাদের চিঠিপত্র পড়ে শোনাতেন। পিয়ানো বাজাতেন। মহিলাদের মতামত চাওয়া হলেও বলে দেওয়া হত, মহিলারা যেন ব্যক্তিগত কথা জানিয়ে পত্র না লেখেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে এই অনুষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক ওঠে। মহিলারা নিজের কথা বলতে শুরু করছিলেন। একটা বিদ্রোহের হাওয়া উঠছিল পুরুষশাসিত সমাজে। সমাজের প্রশ্ন উঠছিল, মহিলাদের কী করা উচিত, বলা উচিত তা ওই সঞ্চালক কেন ঠিক করে দেবেন? বহু লোক সে সময় রেডিয়ো স্টেশনে এসে সঞ্চালককে দেখতে চাইতেন। পেতেন না। কারন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এই অনুষ্ঠান সঞ্চালন করতে প্রথমে ‘মেঘদূত’ ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। পরে নাম নিয়েছিলেন শ্রীবিষ্ণুশর্মা’। কাজেই এই শর্মা অধরাই ছিলেন।

১৯২৮-এ ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের সদর দফতরে যোগ দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসের বেতার কেন্দ্রে। চাকরি তো করতেন, কিন্তু দুপুর হলেই, টিফিনের সময় বা বিকেলে ছুটির পরে তিনি পৌঁছে যেতেন রেডিয়োর বন্ধু-আড্ডায়। এভাবেই রেডিয়োয় যাত্রা শুরু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। ১৯২৭ সালে ডালহৌসির গাস্টির্ন প্লেসে বোম্বাই-এর ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি একটি বেতারকেন্দ্র স্থাপন করে। স্টেশন ডিরেক্টর তখন নৃপেন মজুমদার। তাঁর ডাকেই ১৯২৮-সালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র রেডিয়োয় সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দিলেন। তার পর থেকে কী না করেছেন রেডিয়োর জন্য। তাঁকে ভার দেওয়া হয় সাহিত্য, নাটক, মহিলা মজলিশ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের। প্রথমবারেই তাঁর পরিচালনায় নাটকে অভিনয় করেছিলেন বাণীকুমার, পঙ্কজ মল্লিক, পশুপতি চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৮-এর ২৬ অগস্ট বেতারে সম্প্রচার হয় ‘চিকিৎসা সংকট’ (রচনা পরশুরাম)।

তবে ১৯৪৩ সালে একটি বিশেষ কারণে শুধু সম্মানের প্রশ্নে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু বেতার তাঁকে ছাড়েনি। তৎকালীন স্টেশন অধিকর্তা জানতেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সেই সময় জনপ্রিয়তম শিল্পী। নির্দিষ্ট কালের জন্য তিনি সসম্মানে রয়ে যান চুক্তির ভিত্তিতে উচ্চ বেতনে। সেই ১৯৪৩ থেকে যত দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন, বেতারকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় নাটক। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গৃহপ্রবেশ, ‘সাজাহান’, ‘প্রফুল্ল’, ‘সীতারাম’ উল্লেখযোগ্য। অনেকেই মনে করেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা ডি এল রায়ের নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’। তাঁকে বলা হত রেডিও নাটকের জনক। তেমনই সে যুগের রঙ্গমঞ্চের প্রখ্যাত শিল্পীদের টেনে এনেছিলেন তিনি বেতারে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম শিশিরকুমার ভাদুড়ী, অহীন্দ্র চৌধুরী, নরেশচন্দ্র মিত্র প্রমুখ। এ সবের পাশাপাশি বেতারে তিনি নানা ধরনের অনুষ্ঠান করেছেন।

উত্তর কলকাতায় মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। পিতা রায়বাহাদুর কালীকৃষ্ণ ভদ্র ও মা ছিলেন সরলাবালা দেবী। পরবর্তীকালে ঠাকুমা যোগমায়া দেবীর কেনা রামধন মিত্র লেনে উঠে আসেন তাঁর পরিবার। কালীকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন বহুভাষাবিদ। তিনি ১৪টি ভাষা জানতেন। নিম্ন আদালতে দোভাষীর কাজ করতেন তিনি। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের জগতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ঠাকুমা যোগমায়া দেবীর কাছেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সংস্কৃত শিক্ষা। সেখান থেকেই বোধহয় ‘চণ্ডীপাঠ’-এ মন গিয়েছিল তাঁর। স্মৃতি এতই প্রখর ছিল যে আট বছর বয়সে চণ্ডীপাঠ করে সকলকে চমকে দিয়েছিলেন।

ঠাকুমাই শেক্সপিয়র আর গিরিশচন্দ্রর নাটক পড়ে পড়ে শোনাতেন ছোট্ট বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে। ১৯২৮ সালে স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। তারই ফাঁকে ফাঁকে চলেছিল কম্বুলিয়াটোলায় ‘চিত্রা সংসদ’ ও সাহিত্যিসাধক নলিনীরঞ্জন পণ্ডিত প্রতিষ্ঠিত ‘অর্ধেন্দু নাট্য পাঠাগার’-এ গানবাজনা ও অভিনয় চর্চা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ১৯২৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯২৮ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন। তারপর চাকরি এবং ধীরে ধীরে রেডিয়োর কিংবদন্তী হয়ে ওঠা।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

কোনগুলো শিশু নির্যাতন এবং কিভাবে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যায়। জানাচ্ছেন শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ সত্য গোপাল দে।