পূজা মণ্ডল, কলকাতা : ” আমার স্বপন কিনতে পারে এমন আমির কই, আমার জল ছবিতে রঙ মেলাবে এমন আবির কই “। স্বপ্ন না কিনলেও, স্বপ্ন গড়ে দিতে বিজয়ের স্বপ্নের দোকানে রোজ শয়ে শয়ে লোক জুটে যায়। খাস কলকাতার বুকে এক চাওয়ালার গানওয়ালা হবার স্বপ্ন পূরণে এভাবেই রোজ সুর বেঁধে দিয়ে যান শত শত চা-প্রেমী মানুষ। শহর ভরা রোদ্দুর দিনে পথ চলতি মানুষের হাতে উঠে আসে সুন্দর সাজানো মাটির ভাঁড়ে হরেক কিসিমের চা। তার সাথে উফরি পাওনা বিজয়ের মিঠে গলার গান।

ভোটের মরশুমে দিনভর প্রচারের মাঝে নিজেকে একটু চাঙ্গা করে নিতে তাই বিজয়ের টেস্ট অফ কলকাতাতে গলা ভেজাতে ভিড় জমাচ্ছেন এখন ভোট প্রার্থীরাও। রঙ – দলের অদৃশ্য পোশাক খুলে রেখে এক টুকরো স্বস্তি পেতে বিজয়ের স্বপ্নের দোকানে জোট বাধছেন তারা। বিজয়ের স্বপ্নের দোকানে ভোট বাজারে যেমন দেখা মিলছে কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী মিতা চক্রবর্তীর, তেমনই প্রচারের ফাঁকে গলা ভেজাতে হাজির হয়ে যান কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্রেরই বামপ্রার্থী নন্দিনী মুখার্জী।

স্বপ্ন বাঁচাতে হাতে চায়ের কেটলি তুলে নেওয়া। কারণ গান বাধার স্বপ্ন থাকলেও পকেটে রেস্ত নেই। তাই গানওয়ালা হয়ে উঠতে উচ্চ মাধ্যমিকের পর রাস্তার ধারে চায়ের পসার সাজিয়ে বসা। শহর কলকাতার রবীন্দ্র সরবর মেট্রো স্টেশন থেকে রেলওয়ে ওভার ব্রীজ পেরিয়ে টালিগঞ্জ আদর্শ হিন্দি হাইস্কুলের দিকে এগোলে ওই একই ফুটেই স্কুলের প্রায় গা ঘেঁষেই রয়েছে বিজয়ের স্বপ্নের দোকান।

বাবাও বিক্রি করতেন চা, তাই রোজগারের পথ খুঁজতে গিয়ে বছর আটাশের বিজয় শীলের মাথায় প্রথমেই কড়া নাড়ে চায়ের দোকান খোলার অপশন। এখন যেখানে বিজয়ের দোকান রয়েছে সেখানেই চায়ের দোকান ছিল বিজয়ের বাবার। কিন্তু শিল্পী বিজয়ের হাতে পড়ে হরেক স্বাদের চায়ের অলঙ্কারে সেজে সেই সাদামাটা চায়ের দোকান হয়ে উঠেছে ‘ টেস্ট অফ কলকাতা ‘। কারিকুরি করা মাটির ভাঁড়ে সাধ্যের মধ্যে মিলছে অন্তত প্রায় ৪০ রকমের চা, ৭ রকমের কফি, ১০ রকমের লস্যি, ৮ রকমের মিল্ক সেক, এবং ৭ রকমের সোডা।

মাধমিকের পর সেলসের কাজ নিয়েছিল বিজয়, কিন্তু সারাদিন পথে পথে ঘুরে হাতে আর গানের সময় কই! তাই অনেক ভেবে গান বাঁচাতে, হাতে চায়ের কেটলি আর রাস্তার পাশে ছোট্ট দোকানই বিজয়ের স্বপ্নের বুনিয়াদ হয়ে উঠেছে। এখন রোজ চলে গানের চর্চা। সকাল দশটা থেকে রাত দশটা চায়ের দোকান আর বাড়ি ফিরে ভোর ৫ টা পর্যন্ত গান। তার মাঝেই ২-৪ ঘণ্টার ঘুম, এই হল চা ওয়ালা বিজয় শীলের রোজকার রুটিন।

ক্লাসিক্যাল, সেমি ক্ল্যাসিকাল, ফোক গানে তালিম নিয়েছে বিজয়। গাইতে ভালোবাসে আধুনিক গান আর অবশ্যই পেয়ার ভরি মেলোডি। আগে বহু শো’ও করা হয়েছে, কিন্তু এখন আর সময় মেলে না। এখন শুধুই চর্চা আর নাছোড়বান্দা অ্যালবাম রিলিজের স্বপ্ন। ইতিমধ্যে অবশ্য ইউটিউবে বেশ কয়েকটি গান রয়েছে বিজয়ের। নিজেই গান লেখে গানের সুর দেয়। এমনকি চা নিয়েও গান বেঁধে ফেলেছে সে। চায়ের দোকানে গলা ভেজানোর পাশাপাশি বিজয়ের গানের সুরে মন ভিজিয়ে নিয়ে যান আরোহীরা।

ভোট প্রচারে বেড়িয়ে গলা ভেজাতে আসা প্রার্থী নন্দিনী মুখারজীর কথায়, ” খুব ভালো লাগছে এইরকম একজন নিজেকে দাড় করাতে চাইছে। এখন তো যুব সমাজের কাজের জায়গা বলতে আর কিছু নেই, তাতেও ভালো লাগছে একজন নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। আগে জানা ছিল না, কিন্তু এখানে এসে মন ভালো হয়ে গেল।খুব টেস্টি চা। ওর স্বপ্ন পূরণ হোক। “

চায়ের দোকানে সুর খুঁজতে আসা মলয় পালের কথায়, ” গরমের দিনে আইডিয়াল। গরমের দিনে লস্যির চেয়ে হট টিই বেশী পছন্দ করি, এখানে এত রকমের ভ্যারাইটি পাওয়া যায় যে আসতে ভালো লাগে। তাছাড়া বিজয় যে এতো ভাল গান করে, অ্যালবাম রিলিজ করতে চায় এই ভাবে স্ত্রাগল করে, এই বিষয়টা আরও আমাকে টানে এখানে আসতে। “

আর বিজয়ের কথায় যত দিন না অ্যালবাম রিলিজ করছে ততদিন স্ত্রাগল জারি থাকবে। অ্যালবাম রিলিজের প্রক্রিয়া চলছে বিজয়ের নাছোড়বান্দা মনোভাবে ভর করে। আর অন্যদিকে বিজয়ের স্বপ্নের দোকানও বেড়ে উঠছে একটু একটু করে। কিছু দিনের মধ্যেই বিজয়ের ‘ তৃপ্তি ক্যাফে ‘ও হরেক স্বাদের পসরা সাজিয়ে আসছে
‘টেস্ট অফ কলকাতা ‘র ঠিক পাশেই। আর থাকছে চায়ের সাথে টা, মানে গীটারের স্ট্রিং-এ ঢেউ তোলা বিজয়ের মিঠে গলার গান।

চা-ওয়ালার গান-ওয়ালা হওয়ার অন্যরকম লড়াই…

খাস কলকাতার বুকে এক চাওয়ালার গানওয়ালা হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এভাবেই রোজ সুর বেঁধে দিয়ে যান শত শত চা-প্রেমী মানুষ।

Kolkata24x7 यांनी वर पोस्ट केले मंगळवार, २३ एप्रिल, २०१९