নীলোৎপল বিশ্বাস: ১৯৯৫ সালের জেহানাবাদ। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আগে। ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পাতা জুড়ে হেডলাইন ‘Bihar in Flames’। সকাল সকাল এলাকায় রক্ত বইয়ে গিয়েছে জাতপাতভিত্তিক ‘সেনা’ দল। কত নাম তাদের! সানলাইট সেনা, লোরিক সেনা, রণবীর সেনা। বেলা পড়তেই পালটা দাপট ‘মহাবিপ্লবী’দের (পড়ুন মাওবাদী)। তখনও বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড বিয়োগ কার্যকর হয়নি। তবে ছবিটা বদলাতে চলেছে, আঁচ করছে সব পক্ষই। বিহার মাইনাস খনি-শিল্পের দক্ষিণ বিহার কেবল সময়ের অপেক্ষা৷ কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার প্রাণপণ চাইছে, আগামী দিনে খবরের কাগজের হেডলাইন থেকে যাতে ‘বিহার জ্বলছে’টা কথাটা বাদ যায়। সেইমতো তারাও আদা-জল খেয়ে নেমেছে লালু হটাও অভিযানে৷ কিন্তু কোথায় কী? ১৬৭টা আসনে জিতে ফের বিহারের মসনদে আসীন হলেন ‘বিহারিবাবু’।modi

বিজেপি ৪১ আর কংগ্রেস দৌড় শেষ করল ২৯টি আসনের সান্ত্বনা পুরস্কার হাতে নিয়ে। অতঃপর ফের রক্তপাত, ফের শহরের বাইরে রাত আটটার পর ঝাঁপ বন্ধ। উঠোন পেরিয়ে গোয়ালঘরে যেতেও লোকে থরহরি কম্পমান। এর পর একমাস-দুমাস করে কেটে গেল আরও পাঁচটা বছর। সেই প্রথম দীর্ঘ এক দশক বাদে বিহার জুড়ে বদলের আশায় জোরসে হাওয়া লেগেছে। জন্ম নিয়েছে ঝাড়খণ্ড। নির্বাচন হবে বিধানসভার ২৪৩টি আসনে। কিন্তু বাস্তবে ফলাফল যা হল তা নাকের বদলে নরুণ। ২৪৩টির মধ্যে লালু যাদবের আরজেডির দখলে ১০৩টি আসন। ছবিটা আরও ম্নান হল চারা-ঘোটালার কথা জানাজানি হওয়ার পর৷নাম-কা-ওয়াস্তে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার ছাড়লেন লালুপ্রসাদ যাদব৷বসালেন ঘরণী রাবড়ি দেবীকে। অতএব বদলাল না হেডলাইন। পোড়া ক্ষত থেকে ধোঁয়া ওঠার মতো সেবারেও ‘Bihar in Flames’।

এর পরেই এল এক পর্বান্তরের কাল৷ তত দিনে বিহারবাসী দেখা হয়েছে গণতন্ত্রের নমুনা, জিসকা লাঠি উসকা ভঁইস। এনডিএ জোট প্রথমবারের জন্য ৯২টি আসন পেল, ৫৫টি জেডিইউ-র৷কণ্টকপূর্ণ সেই ভোটের পর এল রাষ্ট্রপতি শাসন। শাপমুক্তির আশায় আশায় থেকে ততদিনে হাল ছেড়েছেন পাটলিপুত্র-রাজগৃহের ভূমিপুত্ররা। ঠিক এমনই একটা সময়ে দেখা দিলেন নীতীশ কুমার নামের এক ‘আজিব আদমি’। অতঃপর তাঁর হাত ধরে বিহারের নতুন পথে যাত্রা৷

কিন্তু এবার সেই নীতীশের সামনেই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ৷ গত সাধারণ নির্বাচনে মোদীর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার তোপ দেগে এনডিএ-র সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন৷কিন্তু তাতে ফল ভালো হয়নি৷দায় কাঁধে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার ছেড়েছিলেন সঙ্গী জিতনরাম মাঝিকে৷কিন্তু সেই জিতনরামও এখন তাঁরই বিরুদ্ধে আঙুল তুলে মোদীর পায়ে পড়েছেন৷পুরানো শত্রু লালুপ্রসাদকে বন্ধু হিসাবে পেয়েছেন বটে, কিন্তু শেষ কথা বলবেন তো তাঁরাই, যাঁরা গত লোকসভা নির্বাচনেও শেষ কথাটি বলেছিলেন৷অর্থাৎ ভোটার৷বিধানসভায় তাঁরা কোনদিকে ঝুঁকবেন? বিহার ব্র্যান্ড, না মোদী ব্র্যান্ড? কোন বদলের লক্ষ্যে বিহার জুড়ে প্রচার চালাচ্ছেন ‘আচ্ছে দিনে’র ফেরিওয়ালা? পরিবর্তন রথ থেকে আর্থিক প্যাকেজ পার করে এবার পাক্কা মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট বা হাইটেক প্রচারের প্রধান হিসাবে পাকড়াও করেছেন গুগলকে। শুক্রবার সকাল থেকেই দেশের বেশিরভাগ ওয়েবসাইট খুললে দেখা যাচ্ছে সাইটের উপরিভাগ জুড়ে গেরুয়ারঙা ব্যানার অ্যাড। তাতে ছাপা মোদী মন্ত্র: “হার বিহারিকা অধিকার, শিক্ষিত অউর বিকশিত বিহার।” শেষে সেই আগের ভোটের বুলি: “বদলিয়ে সরকার বদলিয়ে বিহার”। তৃতীয়বারে নির্বাচনে লড়ার আগে নীতীশ কুমারের সামনে এমনিতেই বহু চ্যালেঞ্জ। একদিকে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে ফেঁসে যাওয়া ‘বিহারিবাবু’কে জোটসঙ্গী করা ও অন্যদিকে মোদী হাওয়া রুখে তাঁর নিজের রাজনৈতিক জীবনের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জে সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়া। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুগল বিজ্ঞাপনের মায়াবী ফাঁদ।

গুগল ওয়েবসাইট বিজ্ঞাপনের শর্তাবলী অনুযায়ী, টাকা দিলেই মেলে গুগল বিজ্ঞাপন ফোরামের সদস্য যে কোনও ওয়েবসাইটে ব্যানার বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ। থ্রিডি ভারত, মেক ইন ইন্ডিয়া, ডিজিটাল লকার ব্যবস্থা যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছে তিনি কি এই সুযোগ ছাড়তে পারেন? সম্ভবত সুন্দর পিচাইয়ের ফোনের ঘণ্টি নাড়িয়েই ফল মিলেছে৷ অতঃপর বিহার-ইউপির গো-বলয় তো বটেই, দেশের তাবড় হিন্দি, ইংরেজি ওয়েবসাইটেও দেখা যাচ্ছে মোদী-মন্ত্র সহ বিজেপির প্রচার বিজ্ঞাপনটি।

এতে লাভ কার? প্রশ্নটা ছেলেখেলার পর্যায়ে নেমে যাওয়ার আগে দুটো উদাহরণ। এক, ভারতের মতো লোভনীয় বাজার গুগল এবং মোদী, উভয়ের কাছেই এখন আক্ষরিক অর্থেই সিদ্ধিদাতা। সদ্য মার্কিন সফরে গিয়ে অকাতরে ‘ভারতে আসুন ভারতে আসুন’ করে ‘নেওতা’ দিয়ে এসেছেন নমো। দুই, সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিহারের মোট ভোটারের ৬০ শতাংশই তরুণ ভোটার। তাদের একটি বিশাল অংশই আবার ‘ওয়েব-ম্যানিয়াক’। অতঃপর ওয়েব বিজ্ঞাপনে লাভই লাভ।

তবু এত কিছুর পরেও প্রশ্ন, মোদীর পাক্কা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের জোরে বিহার সত্যিই ‘আচ্ছে দিনে’র দেখা পাবে তো? নীতীশের এত দিনকার জমানার চাইতেও ‘আচ্ছে’?

পুনশ্চ: ওয়েবে বিজ্ঞাপন না হয় বোঝা গেল। এ তো নতুন নয়৷ লোকসভার দৌড়ে ২০০৯-এ কংগ্রেস, ২০১৪-এ মোদী-শাহর বিজেপিও এর শরণ নিয়েছিল৷পথটা প্রথম দেখিয়েছিল ১৯৬৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কিন্তু বিজ্ঞাপনের এজেন্ডা আর ভোটারের মত যদি না মেলে!  আর তখনই কেলো। সুন্দর পিচাই কেন? জনগণের শেষ কথাকে উলটে দেওয়া শিবেরও অসাধ্যি!