প্রসেনজিৎ চৌধুরী: হিসেব বলছে অবাক কাণ্ড। শাসক বিজেপির মুখেও জমায়েতের চেহারায় সম্ভ্রম দেখা যাচ্ছে। আর ২১০৮ সালের পর বিরোধী সিপিএম নেতারা সেই সব তারিয়ে উপভোগ করে লাল চায়ে ঘন ঘন চুমুক দিচ্ছেন। সংগঠনের রাজ্য দফতর দশরথ দেব স্মৃতি ভবনে অনেকদিন পর স্বস্তির হাওয়া।

হিসেব আরও বলছে- টানা দু দশকের বেশি সময়ের রাজ্যপাট এক লহমায় তাসের ঘরের মতো চলে যাওয়ার মাত্র ১৭ মাসেই শক্তি দেখিয়ে মাঠ কাঁপাল ত্রিপুরা সিপিএম। গত বিধানসভার আসন প্রাপ্তির নিরিখে সিপিএম এই রাজ্যে বিরোধী দল, কিন্তু গত লোকসভার ভোট প্রাপ্তির হারে তাদের স্থান কংগ্রেসের পিছনে।

পূর্ব ঘোষণা মতো সোমবার ছিল সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই ও উপজাতি যুব সংগঠন টিওয়াইএফের বিক্ষোভ সমাবেশ। তার চেহারা দেখে চমকে গিয়েছেন আগরতলা সহ সমগ্র ত্রিপুরাবাসী। আলোচনায় উঠে আসছে, কলকাতায় বাম ছাত্র-যুবদের নবান্ন অভিযানের ধুন্ধুমার পরিস্থিতির প্রসঙ্গ। আগরতলায় সমাবেশে সেই ঝাঁঝের প্রতিফলন রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা দুই বাংলাভাষী প্রধান রাজ্য। এই দুই রাজ্যে দশকের পর দশক টানা ক্ষমতায় থাকা সিপিএম, ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই সাংগঠনিক ভিত্তি হারাতে শুরু করেছে। ত্রিপুরাতে ক্ষমতা হারিয়ে প্রধান বিরোধী দল হলেও পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সংঘর্ষে তেমন জমি পায়নি বামেরা।

সেই সব ধাক্কা উড়িয়েই সোমবারের সমাবেশ থেকে ঝাঁঝালো হুঁশিয়ারি, বিজেপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার এসেছিল, সেই ভিশন ডকুমেন্ট- মিসড কলে চাকরি পূরণ না করতে পারলে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে বিধানসভা ভবন ও মহাকরণ ঘেরাও করা হবে।

আগরতলার বিবেকানন্দ স্টেডিয়াম (আস্তাবল ময়দান) এর এই জনসভায় চাঙ্গা হয়েছে সিপিএম। দলের অন্যতম নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বিজন ধর, গৌতম দাস, প্রাক্তন মন্ত্রী তথা শীর্ষ নেতা বাদল চৌধুরীরা আপ্লুত।

মিছিলের চেহারা ও জনসভার আকৃতি নিয়ে শাসক বিজেপির চিন্তাভাবনাও স্বস্তি দিচ্ছে সিপিএমকে। নাম প্রকাশ না করতে চেয়ে একাধিক বিজেপি নেতা জানিয়েছেন, যে উগ্র মেজাজ দেখা গিয়েছে বাম যুব সংগঠনের মিছিল জমায়েতে তা সরকারের কাছে চিন্তাজনক। তবে সেটা কতটা ভোটের বাক্সে পড়বে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

দেশজোড়া প্রবল মোদী হাওয়ার দাপটে আচমকা পতন হয়ে যায় ত্রিপুরায় লাগাতার ২৫ বছরের বাম শাসন। উপজাতি এলাকায় প্রবল ভোট ব্যাংক ধসের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছিল সিপিএম। সেই মরা বাজারেও ধনপুর কেন্দ্রে নিজের আসনটি ধরে রাখতে পারেন মানিক সরকার। সরকার পরিবর্তন হতেই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হন বিপ্লব দেব।

গত ১৮ মাসে বিপ্লব বাবুর একাধিক মন্তব্যে বারে বারে বিতর্ক ছড়িয়েছে ভারতের সর্বত্র। সর্বশেষ রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে নিখরচায় চিকিৎসা পরিষেবা তুলে নেওয়ার নির্দেশিকা ঘিরে ফের বিতর্কিত বয়ান দেন বিপ্লববাবু। তিনি বলেন, জরুরি বিভাগ এবং ওটি ছাড়া রোগীদের অক্সিজেন লাগে না। এতেও বিতর্ক চরমে ওঠে।

বিরোধী নেতা হিসেবে মানিক সরকার চিঠি লিখে হাসপাতালে নিখরচায় চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানান। তবে সরকার অনড়। এদিকে একধাপ এগিয়ে রাজ্যের বৃহত্তম এলাকা উপজাতি স্বশাসিত পরিষদ অর্থাৎ এডিসি- বোর্ডে ক্ষমতায় থাকা বামেরা জানিয়েছে সরকারের নিয়ম মানা হবে না। এডিসি এলাকায় নিখরচায় চিকিৎসা হবে সরকারি হাসপাতালে।

২০২০ সালে আসন্ন এডিসি নির্বাচন। সেই নির্বাচনকে সামনে রেখেই সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে মারিয়া সিপিএম। সোমবারের জনসভায় যে হারে উপজাতি এলাকার যুবক-যুবতিরা অংশ নিয়েছেন তাতে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে বিজেপির কপালে। কারণ বিজেপি সরকারের জোট শরিক আইএপিএফটি। এই সংগঠনটি আগেই জানিয়েছে, উপজাতি এলাকার নির্বাচনে আলাদা লড়াই করবে। বিজেপির একার শক্তিতে উপজাতি এলাকা ধরে রাখা সম্ভব নয় বলেই দলের শীর্ষ নেতারা জানাচ্ছেন।

বাম সমাবেশ ঘিরে অবাক আগরতলা। শহরবাসী বলছেন, বাম জমানায় এরকম কোনও কিছু দেখা কঠিন নয়, কিন্তু বিরোধী হয়ে সিপিএমের যুব সমাবেশ তাক লাগিয়েছে। লাগাতার রক্তক্ষরণে ক্লান্ত সিপিএম নেতারা লাল চায়ে চুমুক দিয়ে সমাবেশ পরবর্তী দিনটি উপভোগ করছেন। বিখ্যাত মেলার মাঠের একপাশে থাকা দশরথ দেব স্মৃতিভবন চাঙ্গা।