অরুণাভ রাহারায়

আমরা সুখী পর্যটক নই। মন চাইলেই প্যারিসের শেন নদীর প্রমোদতরণী চেপে বিয়ার খেতে খেতে ভেসে বেড়াতে পারব না। কিন্তু, পঙ্গু যেমন পাহাড়ে উঠতে চায়, তেমনই ভ্রমণও মাঝে মাঝে আমাদের হৃদয়মধ্যে ঢেউ দিয়ে যায়।

আজ আমরা ভুটান যাব। কলকাতা থেকে সুনির্মলদা এসেছে আমাদের আলিপুরদুয়ারের বাড়িতে। জুন মাস। ডুয়ার্সে বেশ বৃষ্টি। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই আমারা বেরিয়ে পড়লাম। আলিপুরদুয়ার হল ভুটানের দরজা। এখান থেকে এক বাসে ভুটানে যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা একটু অন্যরকম পথ নিয়েছি। ট্রেনে আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে প্রথমে হাসিমারায় যাব। সেখান থেকে বাসে জয়গাঁ। আর জয়গাঁর ওপারেই ভুটান। এদিক থেকে ভুটানের প্রথম শহর ফুন্টশোলিং।

আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে টিকিট কাটলাম পাঁচ টাকা দিয়ে। কিন্তু ট্রেনের দেখা নেই। ডুয়ার্সের রেলের এই একটাই মুশকিল— কপালের ওপর চলে। মনে, ভাগ্য ভাল থাকলে ঠিক সময়ে আসবে। নাহলে নয়। আমাদের ভাগ্য খারাপ ৪০ মিনিট ধরে স্টেশনে বসে আছি ট্রেন তবু আসে না। সময় কাটানোর জন্য সুনির্মলদার সঙ্গে গল্প শুরু করেছি। প্রসঙ্গত শুভেন্দু লাহিড়ীর কথা উঠল। শুভেন্দুদা স্টেশনের কাছেই থাকেন। ওকে ফোন করলাম। আমাদের ফোন পেয়েই স্টেশনে চলে এল। একটু চাপাচাপি করতেই ও আমাদের সফর সঙ্গী হল।

শুভেন্দুদা আসার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেন এল স্টেশনে। যেন দুজন আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল একসঙ্গে আসবে। কিন্তু মুশকিল হল শুভেন্দুদা সাইকেল নিয়ে এসেছে। সাইকেল রয়েছে স্টেশনের বাইরে। সাইকেল আজ স্টেশনের বাইরেই থাকবে। আমরা থাকবো জয়গাঁয়। তো ট্রেন চলতে শুরু করল। প্যাসেঞ্জার ট্রেন। ট্রেনে মোটামুটি ভিড়। কেউ যাবে চালসা, কেউ যাবে ওদলাবাড়ি। আমরা যাব বিদেশ—ভুটান। তাই আমাদের নামতে হবে হাসিমারা স্টেশনে। আলিপুরদুয়ারে পৌত্রিক বাড়ি হবার সুবাদে ছুটিছাটায় আমাদের বিদেশে (ভুটান) যাওয়ার রেওয়াজ আছে। ভুটানে যাবার সময় মনে পড়ে

পিনাকী ঠাকুরের এই কবিতাটা–

জয়গাঁ থাকেই ফিরছি, আমার বিদেশভ্রমণ কপালে নেই
        ফুন্টশোলিং
        ভুটান মানেই বিদেশ
সঙ্গে এক যুবক শ্রমণ ঝোলায় তাঁর প্রজ্ঞাপারমিতা

বিদেশভ্রমণ কপালে নেই, হাত থেকে হাত, প্রান্তসীমারেখা
         পেরিয়ে যাওয়া
         নো ম্যানস ল্যান্ড
                      ঠোঁট দুটো যে বিদেশ!
সবুজ কাঠের গেস্ট হাউস, হায়নার ডাক হাতির আওয়াজ

সত্যিই তো ভুটান মানেই বিদেশ, অন্তত আমাদের আছে। তাই ভুটানে গেলেই এই কবিতাটা মনে পড়ে। কত পর্যটক ডুয়ার্সে বেড়াতে এসে ফুন্টশোলিং ঘুরে যায়, আর বাড়িতে ফিরে বন্ধুবান্ধবকে গর্ব করে বলে—‘ভুটান ঘুরে এলাম’। আমরা যাচ্ছি সেই ভুটানে। ট্রেন এগিতে যাচ্ছে হাসিমারার দিকে। হ্যামিল্টনগঞ্জে ট্রেন থামতেই আরও প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠে এল। আমরা ঝালমুড়ি খেতে শুরু করলাম। সুনির্মলদা বেশি কৌতূহলী, কারণ সে কলকাতা থেকে এসেছে। আমি আর শুভেন্দুদা ডুয়ার্সের মানুষ। সবুজ চা বাগান, মেঘলা পাহাড় আমাদের চোখের সামনে সবসময়ই ধরা দ্যায়। আমরা এসব দেখতে দেখতেই হাসিমারায় পৌঁছলাম। ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল, আমরা নির্জন স্টেশনে দাঁড়িয়ে রইলাম। এখান থেকেই দেখা যায় দূরের ভুটান পাহাড়, পাহাড়-কোলের মনাস্ট্রি। আমরা একটু পরেই সেখানে পৌছব। কিন্তু থাকবো কোথায়? শুভেন্দুদা বলল, ভুটানে একটা গায়ত্রী মন্দির আছে, এখানে রাত্রিবাস করা যায়। পায়সা লাগে না। আমরা চাইলে কিছু অর্থ ডোনেট করতে পারি, সেক্ষেত্রে ডোনেশন কুপন মেলে। কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। bh-2

আমরা এবার হাসিমারা থেকে জয়গাঁ রওনা হব। সেখানে নেমে গায়ত্রী মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব, রাতে থাকার ব্যাপারে। হাসিমারা স্টেশনের বাইরে থেকে বাস ছাড়ল। দুদিকে শুধুই সবুজ। মধ্যিখানে ডুয়ার্সের বুক চিরে কালো পিচ রাস্তা ছুটে গেছে অনন্তের দিকে। সেই রাস্তা দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কেমন একটা ভেজা ভেজা হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। অনবদ্য সে রাস্তা। জানলা দিয়ে মেঘ-পাহাড় দেখতে দেখতে জয়গাঁয় পৌঁছলাম। বাস থেকে নামে সোজা গায়ত্রী মন্দির। শুভেন্দুদাই কথা বলে সেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা পাকা করল। রাতের থাকার জায়গা নিশ্চিত করেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

পাসপোর্ট ছাড়াই ভুটানের ফুন্টশোলিং শহরে যেতে পারেন ভারতীয় পর্যটকরা, এবং এক্ষেত্রে কোনও রকম নিষেধাজ্ঞা নেই। ফুন্টশোলিংয়ে একাটা মনাস্ট্রি আছে, বেশ সুন্দর জায়গা। সেখানে পর্যটকরা সময় কাটান। আমরা সেখানেই যাব। ভারতীয় সীমানা অতিক্রম করে, ভুটান গেট পেরিয়ে একটা ভুটানি গাড়ি ভাড়া করলাম।  গাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে দেখি, ড্রাইভার ভাড়া চাইছেন বেশি। মনাস্ট্রি ও ভুটান গেট যাতাযাতের খরচ ২০০ টাকা। বেশ কম। কিন্তু শর্ত হল মনাস্ট্রি বা গুম্ফায় ২০ মিনিট সময় বরাদ্দ। এটাই প্যাকেজ। এমন অনেক মারুতি গাড়ি সারাদিন মনাস্ট্রি বা গুম্ফা থেকে ভুটান গেট অব্দি যাতাযাত করে। যাই হোক, ড্রাইভারের শর্ত আমাদের পোষালো না। আমরা বললাম গুম্ফায় পৌঁছে দিতে কত নেবেন? ড্রাইভারের উত্তর ১৩০। আমরা রাজি হলাম। অর্থাৎ ফেরার সময় আমাদের হেঁটে হেঁটে নামতে হবে। তাই হোক। কেননা মনাস্ট্রিতে গিয়ে ২০ মিনিট কাটিয়ে ফিরে আসবো—এটা জাস্ট হয় না। অতএব ওখানে গিয়ে গাড়িটা ছেড়ে দেব। যতক্ষণ ইচ্ছে হবে, ততক্ষণ থাকবো। এলোমেলো ঘুরে বেড়াবো। ভুটান গেট থেকে আমাদের গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই এফ এম এ বেজে উঠল ভুটানি গান। আমরা তো ভুটনিজ ভাষা জানি না! কিন্তু মিউজিকটা আমাদের মর্মে এসে স্পর্শ করল।

bh-3

ভুটানের রাস্তাঘাট অতি সুন্দর। এই দেশে রেলপথ নেই। সড়ক পথই প্রধান পথ। মসৃণ রাস্তা দিয়ে গাড়ি যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই শীত করছে। গাড়ি একটু একটু করে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে প্যেগোডার মতো বাড়িঘর। সেইসব আশ্চর্য ঘরবাড়ি দেখতে দেখতে আমারা মনাস্ট্রিতে পৌঁছলাম। সবুজ ঘাসে পা রাখতেই মন ভরে গেল। আমরা হেঁটে গেলাম বুদ্ধমূর্তিটির কাছে। পৌছনো মাত্রই শুরু হল লামাদের প্রার্থনা। গুম্ফার চত্বরে তখন ভাসছে ‘ওঁ মনিপদ্মে হুম’ ধ্বনি। লামাদের লাল পোশাক উড়ছে হালকা হাওয়ায়। তাঁদের প্রার্থনা শুনে অন্তর যেন পরিশুদ্ধ হয়ে গেল। এরপর মনাস্ট্রির পেছন দিকটায় গিয়ে আমরা সবুজ ঘসের ওপর বসে রইলাম। গাছের তলায় বসে রইলাম। ভেজা ভেজা ঘাস যেন আমাদের শরীর স্পর্শ করছে। এই জায়গাটা বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। এখান থেকে দেখা যায় ভারতের জয়গাঁ জনপদ। সবুজের মনোরম পরিবেশ পেয়ে আমরা অনেকটা সময় কাটালাম। খুব যে বেশি গল্প করলাম বা আড্ডা দিলাম, তা কিন্তু নয়। যেন জগ্ননাথ বিশ্বাসের কবিতার লাইনাটাকেই আমরা তিনজন পালন করলাম— ‘কেউ কেউ স্বল্পবাক হলে খুব ভালো হয়, না-হলে পাহাড় ওই নির্জনাতাটুকু মুছে নেবে।”
যাই হোক, এবার আমাদের ফিরে আসার পালা। ‘ফেরার পথে মেরুণ মেরুণ মেঘে জ্বলতেছিল একখানি মোম, সুসংযত তারই আলোয় পার হচ্ছিলাম যোজন যোজন।’ সত্যিই তো আমরা হেঁটে হেঁটে ভুটান থেকে ভারতবর্ষের দিকে নামছি। তাই হয়তো মনে পড়ে গেল অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর এই কবিতার লাইনটি। সন্ধ্যে নামার আগেই আমরা জয়গাঁ পৌঁছলাম। শেষ হল আমাদের বিদেশ ভ্রমণ।