প্রসেনজিৎ চৌধুরী: চিন মৃত্যুপুরী। ভীত দুনিয়া। আর করোনাভাইরাসের ভয়-কে জয় করেই প্রতিরোধের সর্বাধিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় চমক দিচ্ছে ড্রাগনভূমি ভুটান। বিশ্ব জুড়ে সাড়া পড়ছে এমন উদ্যোগ।

ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও সেটি চিহ্নিত করণের কাজে উঠছে গাফিলতির অভিযোগ। সেই প্রেক্ষিতে ভয় পেয়েও রুখে দাঁড়ানোর শক্তি নিয়ে লাল ড্রাগন চিনের প্রতিবেশী বজ্র ড্রাগন ভুটান বলছে- আমরা প্রস্তুত।

এমন দাবিতে চমকে গেল দুনিয়া। কারণ, ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। ৫০০ পার করেও আরও ভয়াল আক্রমণ শুরু করেছে এই অদৃশ্য শত্রু। তাতেই চিন সহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে ভয়। ভাইরাসের অদৃশ্য হামলায় লাল ড্রাগন কাঁপছে থরথর করে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যত খবর এসেছে, তার নির্যাস দেখলে স্পষ্ট হয় এখনও পর্যন্ত কোনও দেশই ভুটানের মতো এমন দৃঢ়তার সঙ্গে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়তে পারেনি। থিম্পু থেকে যা খবর পাচ্ছি, তাতে জানলাম ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং জাতীয় আইনসভার অধিবেশনে জানিয়েছেন, আমার দেশ পুরোপুরি করোনাভাইরাস ঠেকাতে প্রস্তুতি নিয়েছে।

প্রস্তুতি কেমন ? ড. শেরিং বলেন, ভারত সীমান্তের প্রতিটি এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাঠানো হয়েছে। কাউকে পরীক্ষা থেকে ছাড় দেওয়া হবে না। একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পারো-তে কোনও যাত্রী বাদ পড়ছেন না। তা সে রাজার পরিবারই হোক বা সাধারণ-সবাইকেই করোনাভাইরাস পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে।

এবার আসা যাক আন্তর্জাতিক পর্যটনের শ্রেষ্ঠ স্থান ভুটানের দুটি স্থল সীমান্তের প্রবেশ পথে। একটি আলিপুরদুয়ার জেলার লাগোয়া ফুন্টশোলিং। অপরটি হচ্ছে অসমের চিরাং জেলা লাগোয়া জেলেফু। চেকপোস্টে কোনও যাত্রীকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এতে দুই দেশের স্থানীয় ব্যবসাদারদের বিস্তর অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু করোনাভাইরাস ঠেকাতে ভুটান সরকারের কড়া মনোভাব।

এই দুই সীমান্ত দিয়ে রোজই ভারতীয় ও ভুটানিদের অহরহ যাতায়াত। কারণ নয়াদিল্লি-থিম্পুর মধ্যে ১৯৪৯ সালের ‘বন্ধুত্বের চুক্তি’। দার্জিলিংয়ে হওয়া সেই চুক্তির বলে দুই দেশের নাগরিকদের ভিসা লাগে না।

চিনের গায়ে লেপটে থাকা ভুটানে এখনও পর্যন্ত কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। কিছু চিনা পর্যটককে সন্দেহ করা হয়েছিল। তাদের কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করে সুস্থ বলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরে চিনের সঙ্গে যাবতীয় আসা-যাওয়ার সম্পর্ক সাময়িক ছিন্ন করেছে ভারত, বাংলাদেশ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ একের পর এক দেশ। চিনে থাকা নিজে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি। ব্যতিক্রমী অবস্থান পাকিস্তানের। মরুক গে লোকগুলো, চিনে থাকা পাক নাগরিকদের জন্য অনেকটা এই ধাঁচের মনোভাব ইসলামাবাদের। সেটা নিয়েও কম আলোচনা হচ্ছে না।

এসবের মধ্যেই নীরবে ভুটান নিয়েছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের যথাসম্ভব উদ্যোগ। নেপালে এক সংক্রামক রোগীর সন্ধান মেলায় উপমহাদেশ জুড়ে আলোড়ন ছড়ায়। এর কারণ নেপাল ও ভারতের মধ্যে রোজকার অহরহ যাতায়াত-খোলা সীমান্ত।

ভারতেও করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। পরিস্থিতি বুঝে ভারত সরকার নেপাল লাগোয়া সবকটি রাজ্যের সীমান্তে বসায় বিশেষ পরীক্ষাকেন্দ্র। এর অন্যতম নেপাল লাগোয়া পশ্চিমবাংলার কাঁকরভিটা-পানিট্যাংকি চেকপোস্ট।

নেপালে করোনাভাইরাস রোগীর সন্ধান মেলায় চিন্তিত হয় বাংলাদেশ। চালু হয় পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া সীমান্তে পরীক্ষা শিবির। অভিযোগ, এই সব শিবিরে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত স্থলবন্দর হিলি (দক্ষিণ দিনাজপুর ও বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার চেকপোস্ট)-তে থার্মোমিটার দিয়ে নামমাত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এরপরেই আরও কড়া হয়েছে ভুটান সরকার। পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া এই দেশ তখনই স্থির করে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সেই মতো কাজ শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, সীমান্ত লাগোয়া ভুটানের বাকি জেলাগুলিতেও পৌঁছে গিয়েছেন চিকিৎসকরা। চলছে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পরীক্ষা। আবার যাত্রীবাহী বাস, গাড়ি, লরি কিছুই বাদ পড়ছে না।

প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং জানিয়েছেন, থিম্পু, পারো এবং ফুন্টশোলিংয়ের হাসপাতালে হয়েছে বিশেষ সেল। প্রতিটি জেলা শহর ও বিভিন্ন ছোট বড় স্থানে বসানো হয়েছে সেই চিকিৎসা শিবির। এটাই ভুটানের অবস্থান।

করোনাভাইরাস রুখতে চিকিৎসা ব্যবস্থা করেছে ভুটানের প্রতিবেশী দেশগুলি। অভিযোগ, জনজীবনে ভাইরাস চিহ্নিত করার কাজে রয়েছে খামতি। এখানেই টেক্কা দিয়েছে ভুটান। তাদের রয়েছে সর্বাধিক স্তরে ভাইরাস আক্রান্তকে চিহ্নিত করার কাজ। দেশটির এমন উদ্যোগে সাড়া পড়ছে বিশ্বজুড়ে। উন্নত দুনিয়ার দেশ না হয়েও উন্নত চিন্তাভাবনার প্রয়োগ করছে বজ্র ড্রাগনের দেশ।

তবে চিন জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই কোড-কে ভেঙে প্রতিষেধক বের করার বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে বিশ্বজুড়ে। ভয় ঘিরে ধরেছে চিনের সংলগ্ন ১৪টি দেশ-আফগানিস্তান, ভুটান, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, তাজিকিস্তান, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, উত্তর কোরিয়া, মায়ানমার, লাওস এবং ভিয়েতনামে।

ব্যতিক্রম ভুটান। ভয়কে জয় করে প্রতিরোধের পথ খুঁজেছে ড্রাগনভূমি।