প্রসেনজিৎ চৌধুরী: ফোনটা কিছুক্ষণ পরেই কেটে গেল। আর লাইন লাগছে না। ভুটানের পারো শহরের বাসিন্দা পাওয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। পাও এখন তার দেশে মানে ভুটানে নেই। তার একটি আন্তর্জাতিক মানের চলচিত্রের প্রদর্শন নিয়ে বিভিন্ন দেশে ঘুরছে। তারও চিন্তা ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী নিয়ে তীব্র রক্তাক্ত পরিস্থিতি। কয়েকদিন পরেই তার ফেরার কথা।

পাওয়ের সঙ্গেই কথা বলার মাঝে ভুটান সরকারের বার্তা এলো। তাতে বলা হয়েছে, ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের কারণে রক্তাক্ত অসম। এই পরিস্থিতিতে সাময়িক স্থগিত বিখ্যাত সামদ্রুপ জোংখার সীমান্ত ফটক।

ভুটানের সামদ্রুপজোংখা জেলার একেবারে লাগোয়া উত্তর পূর্বাঞ্চল ভারতের অসমের কোকরঝাড়, চিরাং, বাকসা ও উদালগুড়ি জেলা। আর অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং এবং পশ্চিম কেমাং জেলা।

নেহরু জমানায় নয়াদিল্লি ও থিম্পুর মধ্যে বন্ধুত্বের চুক্তি (১৯৪৯)-এর কারণে ভারতীয় ও ভুটানিদের যাতাযাতে তেমন কড়াকড়ি ছিলনা। তবে সম্প্রতি সেই নিয়মে কড়াকড়ি করা হয়েছে। তবে রোজই বহু সংখ্যক ভুটানি শুধু অসম বা অরুণাচল প্রদেশ নয়, উত্তর পূর্বের অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও যাতায়াত করেন।

কিন্তু গত ৭২ ঘণ্টা ধরে অসম রক্তাক্ত। এই অবস্থায় থিম্পু থেকে ভুটানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বার্তা- সাময়িক বন্ধ করা হল সামদ্রুপ জোংখারের ভুটান গেট। কোনও অবস্থাতেই কোনও ভুটানি নাগরিক ভারতের দিকে যাবেন না। যারা ইতিমধ্যেই ভারতের দিকে গিয়েছেন যে কোনও পরিস্থিতিতে তাদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে অসমে থাকা ভুটানি দূতাবাসের সঙ্গে। সম্ভব হলে দ্রুত দেশে ফিরতে হবে।

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি। এটি এখন আইন। তবে এই আইনটি বিল হিসেবে লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস করানো ঘিরে অশান্ত হয়ে ওঠে অসম সহ উত্তর পূর্ব ভারত।

স্থানীয় উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলির দাবি, নাগরিকত্ব সংশোধনীতে যেভাবে প্রতিবেশী মুসলিম প্রধান দেশগুলি থেকে অ-মুসলিমদের সরাসরি ভারতের নাগরিক করার কথা বলা হয়েছে তাতে বিপন্ন হবে উত্তর পূর্বের নিজস্ব জনভিত্তি।

যেহেতু উত্তর পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সব থেকে ঘনিষ্ঠ, তাই সেখান থেকেই বিরাট পরিমান অ-মুসলিম বাংলাদেশি ঢুকবেন অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম সহ অন্যান্য রাজ্যগুলিতে। এমনই আশঙ্কায় অগ্নিগর্ভ অসম ও ত্রিপুরা।

আবার বিজেপি বিরোধীদের যুক্তি, সংবিধানের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে অবজ্ঞা করেই ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের কাজ করেছে সরকার।

এই দুই তরফা প্রতিবাদে রক্তাক্ত আন্দোলন চলছে অসমে। কার্ফু জারি হয়ে। নেমেছে সেনা। রক্ষীদের গুলি চালানোয় অন্তত ৩ জনের মৃত্যু হয়ছে। বেসরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ৫ জন।

এসব দেখে উদ্বিগ্ন ভুটান সরকার সিদ্ধান্ত নেয় সীমান্ত এলাকার সামদ্রুপজোংখার বিখ্যাত সীমাম্ত ফটক বন্ধ করার। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য তথা আসা যাওয়ার রাস্তা এখন জনশূন্য।

সীমান্তের ওপারে যদি রক্তাক্ত অসমের চিত্র ধরা পড়ে, তাহলে ভুটানের দিকে থমথমে পরিস্থিতি। সামদ্রুপজোংখারের দিকে স্থানীয় বাস স্ট্যান্ডে তেনা পরিচিত ভিড় নেই। থিম্পু-গেলেফু-পারো-ফুন্টশোলিং-পুনাখা যাওয়ার সারিসারি বাস দাঁড়িয়ে। শুনসান স্থানীয় পেট্রোল পাম্প।

সীমান্ত ফটকের সামনে বিশেষ পাহারা দিচ্ছেন রয়্যাল ভুটান আর্মির সদস্যরা। সতর্ক রয়েছে রাজকীয় ভুটানি পুলিশ বাহিনি। সীমান্তের কাছে থাকা সবার পরিচয় পত্র খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। বার বার বলা হচ্ছে কোনও অবস্থাতেই সীমান্ত পার হওয়া যাবে না।

পাওয়ের কাছেও পৌঁছে গিয়েছে এই সব খবর। দূর দেশ থেকে নিজের দেশের সীমান্তের অবস্থায় সেও রীতিমতো চিন্তিত।