নয়াদিল্লি: আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগে ভোপালে গভীর রাতে গ্যাস বেরিয়ে এসে বাতাসে মিশে যাওয়ায় ঘুমের মধ্যেই কেড়ে নিয়েছিল বহু মানুষের প্রাণ।

১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর গভীর রাত আর ৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে ঘটেছিল দুর্ঘটনা৷ মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইড রাসায়নিক ফ্যাক্টরির ‘প্ল্যান্ট নাম্বার সি’ থেকে গ্যাস লিক করেছিল৷ ইউনিয়ন কার্বাইড ফ্যাক্টরি থেকে ৪০ টন বিষাক্ত মিথাইল আইসোসানাইট গ্যাস লিক করেছিল৷ বাতাসে এই গ্যাস মিশে গেলে সেই বায়ু মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক মৃত্যু নিশ্চিত৷ আর সেদিন সেটাই ঘটেছিল৷

সেই রাতের দুর্ঘটনার পর তদন্ত করে জানা যায়, ‘প্ল্যান্ট নাম্বার সি’তে জলের সঙ্গে মিথাইল আইসোসানাইট গ্যাস মেশানো হয়েছিল৷ মিশ্রণ জনিত কারণে গ্যাস ঘনীভূত হতে থাকে৷ একটা সময়ে গ্যাসের পরিমাণ এতটাই বেড়ে যায় যে ট্যাঙ্কে প্রবল চাপ তৈরি করে৷ এরপরই ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসতে থাকে৷ বাতাসের মধ্যে সেই গ্যাস মিশে গিয়ে ভোপালের বহুলাংশে ছড়িয়ে পড়ে৷ মধ্য রাতে ঘুমের মধ্যে মারা যান বহু মানুষ৷

সরকারি হিসেব অনুযায়ী সেই দুর্ঘটনায় ৩৭৮৭ জন মারা যান৷ যদিও বিভিন্ন সংগঠনের দাবি অনুযায়ী মৃত্যুর সংখ্যা আট হাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল৷ এছাড়া সেই দুর্ঘটনার জেরে শারীরিক ভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন বহু মানুষ৷অবশ্য ২০০৬ সালে হলফ নামায় তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ সরকার জানায়, গ্যাস লিকের কারণে ৫ লক্ষ ৫৮ হাজার ১২৫ জন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ যার মধ্যে ৩৯০০ জন আংশিক ও পুরোপুরিভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যান৷

এই গ্যাস দুর্ঘটনায় প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতিও ধরা পড়েছিল৷ তখন ওই প্ল্যান্টের এলার্ম সিস্টেম ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকেজো হয়ে পড়েছিল ফলে তা সেদিন কাজই করেনি৷ ফ্যাক্টরি ম্যানেজারও কোন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেননি৷ ১৯৮৪ সালে ভোপালের জনসংখ্যা ছিল ৮ লক্ষ ৫০ হাজার৷ এখনকার তুলনায় সেই সময় ভোপালের পরিকাঠামো ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না৷ হাসপাতালের সংখ্যাও ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম৷

গ্যাস লিকের কয়েক ঘণ্টার পরই শহর যেন মৃত্যু নগরীতে পরিণত হতে থাকে৷ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হিড়িক পড়ে যায়৷ শ্বাসকষ্ট, চোখ ও ত্বকের সমস্যা, বুকে জ্বালায় শহরবাসী ছটফট করতে থাকে৷ ডাক্তাররাও প্রথমে বুঝে উঠতে পারেননি এই রোগের কারণ ও তার চিকিৎসা কি? শহরের দুটি সরকারি হাসপাতালে প্রথম দু’দিনে ৫০ হাজার মানুষ ভর্তি হন৷ পরে সরকারের তরফ থেকে দুর্ঘটনায় মৃত ও আহতদের পরিবারকে মোট ৭১৫ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়৷ সেই সময় এই মর্মান্তিক ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল সিবিআই৷

তবে এমন ঘটনা ঘটলেও পার পেয়ে গিয়েছিলেন সংস্থার কর্তা৷ ইউনিয়ন কার্বাইডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওয়ারেন অ্যান্ডারসন৷ ভোপালে গ্রেফতার হলেও, দিল্লি থেকে আসা এক রহস্যজনক ফোনের জন্য তাঁর ‘সেফ প্যাসেজ ব্যবস্থা হয়ে যায়৷ এই কর্পোরেট ক্রিমিনাল প্লেনে চড়ে এদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান মার্কিন মুলুকে৷ তারপর বিচারের জন্য বার বার ডাকা হলেও তিনি এদেশে আসেননি৷ শাস্তি এড়িয়ে থেকেছিলেন আজীবন৷

বেশ কিছু রিপোর্ট মনে করে ওই সময় আমেরিকা থেকে প্রধানমন্ত্রী রাজীবগান্ধীর উপর রীতিমতো চাপ এসেছিল অ্যান্ডারসনকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে৷ শাস্তি এড়িয়ে বিদেশে পালানোর বহু বছর পর ২০১৪ সালে ৯২ বছর বয়েসে অ্যান্ডারসনের ফ্লোরিডায় মৃত্যু হয়৷ তবে আজও যেটা অজানা রয়ে গিয়েছে দিল্লি থেকে আসা একটা ফোন কলের ব্যাপারটা- সেটি ঠিক কে করেছিল যার জন্য গ্রেফতার হয়েও ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলেন এই বিদেশি শিল্পকর্তা৷

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV