সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ভারত জুড়ে ‘রাম রাজত্ব’। রাম ভক্তদের বিরোধী হয়ে কোনও কথা বললেই জুটছে দেশদ্রোহীর তকমা। কিন্তু আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে এক বাঙালি তাঁর তত্বে রামায়ণে রাম – সীতার সম্পর্কটাই বদলে দিয়েছিলেন। কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং সেদিনের তথাকথিত ‘ভক্ত’দের রোষে পড়েছিলেন তিনি। তিনি ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।

১৯৬৮ সালে দিল্লি ও কলকাতায় আয়োজিত এক সেমিনারে রামকথার প্রাচীন উৎস নিয়ে তাঁর বক্তব্য পেশ করেন তিনি। সেই বক্তব্য ঘিরেই তৈরি হয়েছিল ব্যাপক বিতর্ক। প্রথমত তিনি সেই সেমিনারে দাবি করেন যে রামায়ণ একা হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ নয়। তিনি বৌদ্ধদের দশরথ-জাতকের ১৩টি পালি গাথার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এও দাবি করেছিলেন এই মহাকাব্য ঋষি বাল্মীকির একার কৃতিত্ব নয়। বহু মুনির চেষ্টায় রচিত হয়েছিল রামায়ণ। ভাষাবিদ তথ্য দিয়ে প্রমাণও করে দিয়েছিলেন। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। তবে বিতর্ক ডানা বাঁধতে শুরু করেছিল।

তা বড় আকার নেয় যখন তিনি বলেন , রামায়ণের রাম-সীতার সম্পর্ক সহোদরের। অর্থাৎ মহাকাব্যের নায়ক নায়িকা যাদের ঘিরে লঙ্কাকাণ্ড তাঁরা নাকি ভাই বোন! তাঁদের আবার বিবাহও হয়েছিল। ২০১৯ সালে দাঁড়িয়েও বাস্তবে এমন সম্পর্ক মেনে নেবে না কেউ। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এমন কথা তাও আবার যেখানে ধর্ম কর্ম জড়িয়ে। আর দেখে কে। ভাষাচার্যকে তীব্র ভর্তসনার শিকার হতে হয়েছিল। গালিগালাজ থেকে শুরু করে বাড়িতে হুমকি-চিঠি কিছুই বাদ যায়নি। দেশ জুড়ে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক বিতর্ক।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলছেন এর অর্থ কোথাও তার সত্যতা অবশ্যই রয়েছে। আমৃত্যু যুক্তিবাদী মানুষটি শত আক্রমণেও কখনও নিজের জায়গা থেকে সরে যাননি। উলটে বারবার তাঁর পেশ করা তত্বের প্রমাণ দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘পণ্ডিতরা যদি আমার মত ভুল প্রমাণ করেন, আমার কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু ভক্তবাবাজিদের আবেগের কাছে হার স্বীকার করব না।’ শিবভক্ত ছিলেন সুনীতিবাবু। গড়গড়িয়ে গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করতেন। মহালয়ার তর্পণ করতেন। আবার তিনি এও বিশ্বাস করতেন না যে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে তাঁর দেওয়া জলে পূর্বপুরুষেরা তুষ্ট হচ্ছেন। তাঁর ধর্মবোধে কোনও অন্ধতা ছিল না, ছিল ঐতিহ্যের অনুসন্ধান। ঠাকুর ঘরে গিয়ে যেমন গীতা উপনিষদ পড়তেন। তেমনই সেখানেই পাঠ করতেন বাইবেল, কোরান, রামায়ণ, রবীন্দ্রনাথ। রামায়ণকে ভারতের মহান ঐতিহ্য বলেই মনে করতেন।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হাওড়া জেলায় শিবপুরে ১৮৯০ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মতিলাল শীল ফ্রি স্কুল থেকে ১৯০৭ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান অধিকার করে কুড়ি টাকা বৃত্তি লাভ করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯০৯ সালে ৩য় স্থান অধিকার করে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ১৯১১ সালে ইংরেজিতে সম্মানসহ বি.এ শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯১৮ সালে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি এবং জুবিলি গবেষণা পুরস্কার অর্জন করেন। জীবনের অন্যতম আরাধ্য ব্যক্তি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভাষাচার্য উপাধি দিয়েছিলেন কবিগুরু স্বয়ং।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ