সম্প্রতি চীনের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং তাঁদেরই৷ যদিও এটা কিছু নতুন কথা নয়, তবু দলাই লামার আসন্ন তাওয়াং সফরকে কেন্দ্র করে কমিউনিস্ট চীন যে অখুশি সেটা তারা বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে৷ দলাই লামা যে এই প্রথম তাওয়াংয়ে যাচ্ছেন তা-ও নয়৷ ২০০৯ সালেও তিনি সেখানকার ঐতিহাসিক বৌদ্ধমঠে গিয়েছিলেন৷ সেবারও ভারত সরকার তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল৷ এবারও দিয়েছে৷ আগেরবারও তাঁর সফর নিয়ে চীন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল, এবারও করছে৷ যদিও করছে তুলনামূলকভাবে বেশ নরম সুরে৷ বেজিংকে যারা জানে তারা বোঝে— ব্যাপারটা কতখানি বিপজ্জনক৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

১৯৫৯ সালে মাওয়ের চীন যখন ভারতের ১ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের বলে দাবি করেছিল তার মধ্যে অরুণাচল প্রদেশের গোটাটাই ছিল৷ তখন অরুণাচলের নাম ছিল NEFA৷ যদিও অরুণাচল প্রদেশের লোককথায় সেখানকার মানুষ যে একদা চীনা সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, এ রকম কোনও কিছুর নামগন্ধও নেই৷ আসলে ১৯৪৯ সালের পর থেকেই আগ্রাসী চীন যেভাবে তিব্বতকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে দাবি করেছে এবং ১৯৫০ সালে গায়ের জোরে লাসা দখল করে বন্দুকের নলের ডগায় সেখানে হান সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে চাপিয়ে দিয়েছে, ভারতের অন্যতম প্রদেশ অরুণাচল প্রদেশ সম্পর্কেও তাদের মনোবাঞ্ছা একই৷ সুতরাং, তাদের নরম-গরম যে কোনও রকম ফাঁদে পা দিলেই বিপদ আরও পেয়ে বসবে৷ আপাতত হুঁশিয়ার থাকতে হবে, এই যা৷

ঠিক এমন একটা দিনে তাওয়াং নিয়ে চীনা বিশেষজ্ঞদের ‘সুচিন্তিত’ মতামত জানা গেল যেদিন দিল্লির পাক হাই-কমিশনার আবদুল বাসিত জম্মু-কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ফের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ বললেন এবং ভারত-নেপাল সীমান্তে কে বা কারা আবারও সীমা সশস্ত্র বলের উপর চড়াও হল ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বেশ কয়েকটা গুমটি পুড়িয়ে দিল৷ ১৯৬২ সালের চীনা আক্রমণের আগেও কিন্তু ভারতের সীমান্ত লাগোয়া দেশগুলিতে একটা অশান্তি বাধানোর প্রক্রিয়া চলেছিল৷ সুতরাং, ব্যাপারটাকে নেহাৎ সমাপতন মনে করা ভুল৷

১৯৬২-র চীনা আক্রমণের বহু আগে থেকেই চীনের মতিগতি সম্পর্কে জওহরলাল নেহরুকে যিনি বারংবার হুঁশিয়ার করেছিলেন তাঁর নাম ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়৷ যেমন, ১৯৬০ সালেই নেহরুকে তিনি কালিম্পংয়ের চীনা বাণিজ্য দফতরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন৷ সীমান্ত ইস্যুতে চীন তখন সাময়িকভাবে মুখ বুজে থাকার ট্যাকটিকস নিয়েছে৷ জওহরলাল নেহরু তাতেই সন্তুষ্ট৷ বিধান রায়কে তিনি বললেন, ওই দফতরের তো এমনিতেই আর কোনও গুরুত্ব নেই৷ ভায়া তিব্বত দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যই হচ্ছে না৷ ওখানে তালা ঝোলালেই বা কী, না ঝোলালেই বা কী৷ বিধান রায় কিন্তু নিজস্ব প্রশাসনিক সূত্রে খবর পেয়েছিলেন— কালিম্পংয়ে চীনা বাণিজ্য দফতর আসলে মাও সে তুংদের গুপ্তচর বাহিনী হিসাবেই কাজ করছে৷

তিব্বত সম্পর্কে চীনা শাসকদের আগ্রাসী মনোভাবের লক্ষণ যে ১৯৫০ সালেই প্রথম দেখা গিয়েছিল তা কিন্তু নয়৷ ১৯১০ সালেও তৎকালীন চীনা রাজশক্তি গায়ের জোরে লাসা দখল করেছিল৷ তার কারণ, তৎকালীন ত্রয়োদশ দলাই লামা চীন সম্রাটের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে রাজি হননি৷ মজা হল, সপ্তদশ শতকে তদানীন্তন নবম দলাই লামা যখন চীন সম্রাটের দরবারে গিয়েছিলেন তখন তিনিও হাঁটু গেড়ে বসতে রাজি হননি৷ কিন্তু তার জন্য তাঁকে অপমানিত হতে হয়নি৷ বরং, চীন সম্রাটের এক পংক্তিতেই তাঁকে ভূষিত করা হয়েছিল৷ কিন্তু ত্রয়োদশ দলাই লামার আর সেই সৌভাগ্য হল না৷ পিকিং (আজকের বেজিং) থেকে তিনি লাসায় পা দেওয়ামাত্র চীনা সেনারা শহর আক্রমণ করল৷ দলাই লামার সব মন্ত্রীকে হত্যা করল৷ দলাই লামা কোনও ক্রমে ব্রিটিশ এজেন্টের ‘ডাকওয়ালা’ সেজে তাদের হাত এড়ালেন৷ ব্রিটিশ এজেন্ট চার্লস বেলের সঙ্গে ভারতে এসে আশ্রয় নিলেন৷ ১৯১১ সালে চীনে রাজতন্ত্রের অবসানের পর ডাঃ সান ইয়াৎ-সেন সেদেশের প্রেসিডেন্ট হন৷ ত্রয়োদশ দলাই লামাও আবার সসম্মানে সোনার পালকিতে চড়ে লাসায় ফেরেন৷

মাও সে-তুং চীনের ক্ষমতায় আসার পর চীনা শাসককুলের মধ্যে আবার আগেকার আগ্রাসী মনোভাবটা ফিরে আসে৷ জওহরলাল নেহরু যেটা বুঝেও বুঝতে চাননি৷ এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে সেই সময় ভারতের বিদেশ সচিব বাজপাই কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের বারংবার মতবিরোধ হয়েছে৷ চীনকে বিশ্বাস করলে পস্তাতে হবে, এ কথা যাঁরাই বলেছেন উলটে তাঁদেরই বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছেন নেহরুর বিদেশমন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন৷ আর এ নিয়ে কৃষ্ণ মেননকে নেহরু যখনই কিছু জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছেন অমনি ব্যক্তিগত মানসিক সমস্যার কথা তুলে তিনি কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন৷ নেহরু আর কিছু বলতে পারেননি৷ কিন্তু সেই সময় যাঁরাই চীন সম্পর্কে নেহরুকে হুঁশিয়ার করেছিলেন, পরবর্তীকালে তাঁদের কথাই অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল৷ পিকিংয়ে ভারতের রাষ্ট্রদূত পানিক্কর কিংবা বিদেশমন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন যে নেহরুকে কতটা বিপথে চালিত করেছিলেন, ’৬২-র চীনা আক্রমণ ছিল তার জ্বলন্ত উদাহরণ৷

চীনা বিশেষজ্ঞরা আজ বলছেন তাওয়াং তাঁদের৷ কাল বলবেন নেপাল, ভুটান এবং ভারতের অঙ্গরাজ্য সিকিমও তাঁদেরই অংশ৷ এই অবস্থায় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের হুঁশিয়ারির কথা মনে রেখে ভারত সরকারের উচিত— এদেশে কমিউনিস্ট চীনের পঞ্চম বাহিনীকে খুঁজে বের করা৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ