সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকে যা খবর বেরিয়েছে সেই অনুসারে ভারতের তরফ থেকে একদিকে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে যেমন চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে, ঠিক তেমনই অন্যদিকে প্রতিবেশী কলম্বো এবং মালের কাছে প্রতিরক্ষার খাতিরে দিল্লি সহায়তাও চেয়েছে৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

এর মধ্যেই ডোকালামে শীতের সময়ে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আয়োজন করে ফেলেছে চীনা ফৌজ৷ এই ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে যাতে নতুন করে কোনও সমস্যা দেখা না দেয়, তার জন্য ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছেন৷ ভারতের লক্ষ্য, প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যগত সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা৷ সে কারণে রাশিয়া ও চীন উভয় দেশের সঙ্গেই ভারত হালে একটি সমঝোতাও করেছে৷ যদিও সন্ত্রাস বিরোধিতার প্রশ্নে সেই যৌথ বিবৃতিতে লস্কর-ই-তোইবা এবং জয়েশ-ই-মহম্মদের কোনও উল্লেখ ছিল না৷ আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার বাণী সেখানে থাকলেও অদ্ভূতভাবে লস্কর-ই-তোইবা ও জয়েশ-ই-মহম্মদের সম্পর্কে তিন দেশই ছিল সরকারিভাবে নীরব৷ অন্তত ত্রিপাক্ষিক বিবৃতিতে এদের সম্পর্কে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি৷

ওই আলোচনা শেষ হতে না হতেই জানা গেল, ডোকালামে চীন আবার সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে৷ শীতের সময়টা ওই বিতর্কিত পয়েন্টে কাটাবে বলে পিপলস লিবারেশন আর্মির অন্তত ১৮০০ সেনা সেখানে ছাউনি ফেলেছে৷ শুধু তাই নয়, সাময়িকভাবে সাপ্লাই লাইন ঠিক রাখার জন্য তারা দুটি হেলিপ্যাড এবং রাস্তাও তৈরি করে ফেলেছে৷ অর্থাৎ, শান্তি বজায় রাখার জন্য চীনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার নিট ফল কিন্তু ওই দেশেরই রণসজ্জা৷ আর, সেটা শুধু সামরিকভাবে নয়, অন্যভাবেও৷

ভারতের প্রতিবেশী দেশ নেপালে ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছে মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বাধীন বামজোট৷ তাদের এই জয়ের পিছনে পুরোপুরিভাবেই বেজিংয়ের মদত কাজ করেছে৷ পাশাপাশি, ভারতের আর এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে ৯৯ বছরের জন্য হেমবন্তটোটা বন্দরটি লিজ নিয়েছে চীন৷ এর পরেও দিল্লি আশা করছে, চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলার চীনা নীতি তারা মিষ্টি কথায় সামাল দিতে পারবে? প্রতিবেশীদের কাছে দিল্লি অনুরোধ জানাল, তোমরা দেখ যাতে আমাদের নৌ নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, আর অমনি তারা সে কথা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিল— এই স্বপ্ন দেখলে বলতে হবে ভারতের নেতৃত্ব এখনও ছেলেভুলানো রূপকথার যুগে পড়ে রয়েছেন৷

তোষণনীতিতে যে চীনা নেতৃত্বের আগ্রাসী স্বভাবের মোকাবিলা সম্ভব নয়, এটা অন্তত দিল্লির বোঝা উচিত ছিল৷ বোঝা উচিত ছিল, পাকিস্তানের মিলিটারির সঙ্গে চীনা মিলিটারির সম্পর্কটা এখনও সব ঋতুর বন্ধুত্বের৷ বোঝা উচিত ছিল, চীনের আগ্রাসী নীতির সঙ্গে হিটলারের আগ্রাসী নীতির মূলগত কোনও ফারাক নেই৷ সুতরাং, সেই নীতির মোকাবিলায় তোষণনীতি চালালে ফলাফলটা শেষ পর্যন্ত সুদেতেনল্যান্ড, অতঃপর চেকোস্লোভাকিয়া গ্রাস এবং তারপর পোল্যান্ড আক্রমণের মতোই দাঁড়াবে৷ লালচীনের মিথ্যাচারে ভুলেছিলেন বলেই জওহরলাল নেহরুকে ১৯৬২ সালে মাও সে-তুংদের হানাদারির মুখে পড়তে হয়েছিল৷ সেই শিক্ষা যে আদতে কাজে লাগেনি সেটা ভারতের ইদানীংকার নেতৃত্বের কার্যকলাপ থেকেই পরিষ্কার৷ তাঁরা এখনও চীনের ‘সদিচ্ছা’ এবং ‘সুবিবেচনা’র উপর ভরসা রাখছেন৷ যদিও তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে, যাদের মুখের দিকে তারা তাকিয়ে আছেন চীনের সঙ্গে মোকাবিলার সময় তারা ভারতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে৷ তার কারণ, চীনের সঙ্গে এঁটে ওঠার ক্ষমতা তাদের নেই৷ উলটে, তারা নিজেরাই চীনের কাছে বিকিয়ে গিয়েছে৷

আরও হাস্যকর হল, মালদ্বীপের কাছে সহায়তা চাওয়া৷ যে দেশে এখন ইসলামিক স্টেট বা আইএস সব থেকে বড় বিপদ এবং যেদেশের কর্তারাই বিপথগামী তরুণ প্রজন্মকে হাতে রাখতে আইএসকে তোল্লাই দেওয়ার পক্ষপাতী, ভারতীয় নেতৃত্ব চাইছেন তারা নৌ-নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়াক! এক সময় যে দেশের প্রেসিডেন্টকে জলদস্যুদের কবল থেকে বাঁচাতে ভারতের নৌবাহিনী অভিযান চালিয়েছিল এবং অবলীলায় সেই দেশের প্রেসিডেন্টকে উদ্ধার করেছিল, আজ এসে সেই দেশের কাছেই ভারতের নেতৃত্ব নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করছে! এর চাইতে হাস্যকর আর কী-ই বা হতে পারে৷
বড় ‘কূটনৈতিক’ (পড়ুন, ব্যাবসা-বাণিজ্যে) লাভের আশায় ভারতের নেতৃত্ব এখন চীনের সঙ্গে দোস্তি বজায় রাখার রাস্তা নিয়েছেন৷ এ ব্যাপারে খোদ ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াত সতর্ক করলেও তাঁকে ধমকে দেওয়া হচ্ছে৷ এমনকী দোস্তি বজায় রাখতে ভারতের নেতানেত্রীরা চীনের সঙ্গে আলোচনার সময় প্রকাশ্যে হাফিজ সঈদ কিংবা মাসুদ আজহারের নাম পর্যন্ত নিতে চাইছেন না৷ অথচ, বিপদ যখন শিয়রে এসে হাজির হয় তখন এই নেতানেত্রীদের মর্যাদা রক্ষায় শেষ পর্যন্ত ভারতের সেনাবাহিনীকেই ময়দানে নামতে হয়৷ বাণিজ্য মহলের কোনও তাইকুন কিংবা কোনও পলিটিক্যাল অপারেটর মাফিয়া চক্রকে সেই সময় খুঁজে পাওয়া যায় না৷

আমেরিকার প্রশাসন যেখানে হাফিজ সইদের লস্কর-ই-তোইবা এবং মাসুদ আজহারের জয়েশ-ই-মহম্মদকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসাবে কালো তালিকাভুক্ত করে দিয়েছে সেখানে ভারত-চীন-রাশিয়ার ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় কেন তাদের নাম উল্লেখিত হল না, সেটা যারপরনাই বিস্ময়কর ব্যাপার৷ এতবার হোঁচট খেয়েও যদি ভারতের নেতৃত্ব শিক্ষালাভ না করেন, তাহলে তাঁদের পালটা আঘাত সহ্য করতেই হবে৷ একদিকে চীন যেমন চারিদিক থেকে নাগপাশে ভারতকে ঘিরে ধরবে, অন্যদিকে ঠিক তেমনই জাকির নায়েককে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে ইন্টারপোলও ভারতের পুলিশ প্রশাসনের নাকে ঝামা ঘষে দেবে৷

দেশরক্ষার ইস্যুতে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষকেই পস্তাতে হয়৷ সন্ত্রাস-বিরোধী অভিযান এবং দেশের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তাই যেখানে ভারতবাসীকে রক্ষা করার প্রাথমিক শর্ত সেখানে যদি এক শ্রেণির বিবেকহীন বানিয়া, ফড়িয়া ও হাওলাদারদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে যা ঘটে সেটাই এখন পদে পদে ঘটছে৷ রাজনীতিকদের চিন্তা নেই এ কারণেই যে, যা-ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত অবস্থা সামাল দিতে তো জল-স্থল-অন্তরীক্ষে ভারতের সেনারা প্রস্তুতই আছেন৷ মাঝখান থেকে যদি কিছু পলিটিক্যালি গেন করা যায়, সেটাই লাভ৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ