কলকাতা: সদ্য সমাপ্ত হওয়া সুনীল-উৎসবে এমন প্রসঙ্গই উঠে এল। বাংলা না লেখা থাকায় এক সময় এক্সাইড মোড়ের হলদিরামের সাইনবোর্ড ভাঙতে উদ্যত হয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তবে সুনীলের জনপ্রিয়তা এমনই যে তাঁকে চিনে ফেলেন হলদিরামের অবাঙালি মালিক। উল্টে সাইনবোর্ড ভাঙতে এসেছেন শুনেও সুনীলকে ডেকে দোকানে বসান এবং আপ্যায়ন করেন! পাশাপাশি কথা দেন পরের দিনই সাইনবোর্ডে বাংলায় লেখা থাকবে দোকানের নাম৷

৩০ নভেম্বর সুনীল-উৎসবের শেষ দিন নন্দন তিনে ছিল কবি সুবোধ সরকারের সঙ্গে সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যের কথোপকথন। তাঁদের কথাবার্তার বিষয় অবশ্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আড্ডার শিরোনাম রাখা হয়েছিল সুনীলের বইয়ের নাম অনুসারে: ‘সুন্দরের মনখারাপ’। ওই কথোপকথনে কবি সুবোধ সরকারের কণ্ঠে উঠে আসে বাংলা ভাষার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কর্মকাণ্ড! সুনীল-উৎসবের সভাপতি (যার পোশাকি নাম: দেখা হবে চন্দনের বনে) সুবোধ সরকার বলেন, বাংলা ভাষার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য।

“তখন বাংলা ভাষা নিয়ে রাজ্য উত্তাল। রাস্তায় নেমে পড়েছে অনেকে। সুনীলদার নেতৃত্বে রাস্তায় রাস্তায় সাইনবোর্ড দেখে বেড়ানো হত। আমরাও সেই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলাম। আপনারা এক্সাইডের মোড়ে যে হলদিরামে খাওয়াদাওয়া করেন, সেই হলদিরামের সামনে গিয়ে আমরা দাঁড়ালাম। দোকান থেকে একজন বেরিয়ে এসে ‘সুনীল জি, সুনীল জি নমস্তে’ বলে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন এবং সুনীলদাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে চাইলেন।” এমন স্মৃতির কথাই অডিটোরিয়াম-ভর্তি শ্রোতার সামনে বলেন সুবোধ সরকার।

ঠিক এর পরেই সুবোধের কণ্ঠে উঠে আসে, “তখন সুনীলদা বললেন, আমাকে ভেতরে নিয়ে যেতে চাইলে কী হবে! আমি আপনার দোকান ভাঙতে এসেছি। সাইনবোর্ডে বাংলা কোথায়? মালিক হেসে বললেন– ‘আরে কী বলছেন! আগে দোকানে আসুন, চা খান।’ এই বলে আমাদের সবাইকে নিয়ে সুনীলদা বসলেন দোকানে।”

সুবোধ বলেন, “আমরা বুঝলাম এই অবাঙালি সুনীলদার লেখার পাঠক নয়। কিন্তু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চেনেন। হলদিরামের মালিক সেদিন একটা কথাই বলেছিলেন– ‘কাল থেকে আমরা বাংলা সাইনবোর্ড লাগাব’। সেই থেকে হলদিরামের সাইবোর্ড বাংলায় লেখা হল”।

এদিনের সুবোধের কথায় উঠে আসে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে সুনীলের সুম্পর্কের কথা৷ তিনি মনে করালেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রায়শই বলতেন, “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ভাল মানুষ আমি দেখিনি। আপনারা ভাবুন, এই কথাটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সেই সময় বলছেন!”

ইদানীং সকলেই দেখেন, বাংলা ভাষার জন্য ‘বাংলা পক্ষ’ নামক সংগঠনটির লাফালাফি। সংস্থার সদস্যরা প্রতিদিনই বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনে নামেন। তাঁদের কীর্তি মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু, ক’জন মনে রেখেছেন বাংলা ভাষার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই অবদানের কথা। বাংলাপক্ষের সদস্যরাও বা কতটা মনে রেখেছেন সেই কথা ৷ শুধু নিজের লেখালিখি নিয়েই আত্মমগ্ন থাকতেন না সুনীল। পাশাপাশি তিনি ভাবতেন বাংলা ভাষা নিয়ে। সেই প্রসঙ্গই উঠে এবারের এল সুনীল উৎসবে।